আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের কাছ থেকে নতুন করে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার সহায়তা চাওয়ার বিষয় সামনে আসায় সরকার আবারও বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ, জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজন থেকেই সরকার নতুন অর্থায়নের পথ খুঁজছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামের ওঠানামা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর ফলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ওয়াশিংটনে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন ঋণ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৫৫০ কোটি ডলারের একটি প্যাকেজে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭০ কোটি ডলার ছিল মূল চুক্তি এবং পরে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার সহায়তা যুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে। তবে সংস্কার শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির প্রায় ১৩০ কোটি ডলার এখনো আটকে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ পাওয়া গেলে তা স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর সঙ্গে কঠোর শর্ত যুক্ত থাকার সম্ভাবনাও প্রবল। ভর্তুকি কমানো, করব্যবস্থা সংস্কার, করছাড় সীমিতকরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো আবারও সামনে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব শর্ত বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, যা খাদ্যপণ্য, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে নতুন ঋণ না নিলে সরকারকে রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে হতে পারে। এতে আমদানি সক্ষমতা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং টাকার বিনিময় হার নতুন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। টাকার মান কমে গেলে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ঋণ পরিস্থিতি
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| ২০২৩ সালের মূল ঋণ চুক্তি | ৪৭০ কোটি ডলার |
| অতিরিক্ত সহায়তা | ৮০ কোটি ডলার |
| মোট ঋণ কর্মসূচি | ৫৫০ কোটি ডলার |
| এখন পর্যন্ত ছাড়কৃত অর্থ | ৩৬৪ কোটি ডলার |
| আটকে থাকা কিস্তি | প্রায় ১৩০ কোটি ডলার |
| সম্ভাব্য নতুন ঋণ আবেদন | ২০০ কোটি ডলার |
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, নতুন ঋণ গ্রহণের আগে সরকারের সুস্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা, অর্থ ব্যবহারের অগ্রাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ জরুরি। অন্যথায়, স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বস্তি এলেও ভবিষ্যতে ঋণের চাপ ও জনজীবনের ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
