ধর্ষণের বিচার চেয়ে প্রাণ গেল কিশোরীর: নরসিংদীতে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড

নরসিংদীর সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নে এক কিশোরীর করুণ মৃত্যু কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আমাদের বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে প্রথমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে সেই অন্যায়ের বিচার চাওয়ায় পরিকল্পিতভাবে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এক শর্ষেখেত থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধারের পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত কিশোরীর পরিবার গত কয়েক বছর ধরে মহিষাশুড়া ইউনিয়নের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিল। তার বাবা স্থানীয় একটি টেক্সটাইল কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের এই ছোট পরিবারটিতে সচ্ছলতা না থাকলেও শান্তি ছিল। কিন্তু সেই শান্তি কেড়ে নেয় স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত ‘নূরা’ ও তার সহযোগীরা।

পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে বাড়ি ফেরার পথে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন যুবক ওই কিশোরীর মুখ চেপে ধরে তাকে নির্জন স্থানে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পাশবিকভাবে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। এই ভয়াবহ ঘটনার পর পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা আইনি ব্যবস্থার চেয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিচারের প্রত্যাশা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আহমদুল্লাহর কাছে বিচার দাবি করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ওই জনপ্রতিনিধি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি ঘটনাটি ‘মীমাংসা’ করার আশ্বাস দিয়ে পরিবারটিকে কয়েকদিন চুপ থাকতে বলেন এবং এক পর্যায়ে তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মতো অ-আপসযোগ্য (Non-compoundable) অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের সালিশি বা মীমাংসার চেষ্টা কেবল অপরাধীদের উৎসাহিত করে না, বরং এটি নিজেই একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগী পরিবার যখন দেখল স্থানীয়ভাবে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, তখন তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করে।

গত বুধবার রাতে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে বাবা সিদ্ধান্ত নেন তার মেয়েকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার। রাত ৮টার দিকে তিনি মেয়েকে নিয়ে খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা নূরা ও তার পাঁচ-ছয়জন সহযোগী তাদের পথরোধ করে। বাবার সামনে থেকেই কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন অসহায় বাবা তার সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বখাটেদের শক্তির কাছে তিনি পরাজিত হন।

নিচে ঘটনার একটি সময়ক্রম সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

তারিখ ও সময়ঘটনাপ্রবাহমন্তব্য
প্রায় ১৫ দিন আগেকিশোরীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।মূল অভিযুক্ত বখাটে নূরা ও তার দলবল।
ঘটনার পরবর্তী সপ্তাহসাবেক ইউপি সদস্য আহমদুল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা।বিচার না পেয়ে এলাকা ছাড়ার পরামর্শ প্রদান।
বুধবার, রাত ৮:০০ টানিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে বাবার কাছ থেকে অপহরণ।অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে চূড়ান্ত হামলা চালায়।
বৃহস্পতিবার, সকাল ৯:৩০ টাস্থানীয়দের মাধ্যমে মরদেহ শনাক্তকরণ।বিলপাড় ও দড়িকান্দী গ্রামের মাঝামাঝি শর্ষেখেতে লাশ উদ্ধার।
বৃহস্পতিবার, দুপুর ১২:৩০ টাপুলিশ কর্তৃক মরদেহ উদ্ধার ও সুরতহাল সম্পন্ন।ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে প্রেরণ।

মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ধর্ষণের বিচার চাওয়ার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত নূরা, তার সহযোগীরা এবং এমনকি সাবেক ইউপি সদস্য আহমদুল্লাহও বর্তমানে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাদের মতে, যদি প্রথমবার ধর্ষণের পরই পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ এই কিশোরীকে প্রাণ হারাতে হতো না। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

এই হত্যাকাণ্ড সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে কয়েকটি গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রথমত, প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষরা কেন সরাসরি থানায় না গিয়ে স্থানীয় ‘মাতব্বর’ বা ‘সাবেক মেম্বারদের’ কাছে বিচার চায়? দ্বিতীয়ত, অপরাধীরা কতটা প্রভাবশালী হলে একজন বাবার সামনে থেকে তার সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়ার সাহস পায়?

বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনায় আপস করার কোনো সুযোগ নেই। এই ট্র্যাজেডি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অপরাধীদের সাথে কোনো ধরনের আপস নয়, বরং শুরুতেই আইনি সুরক্ষা গ্রহণ করা অনিবার্য। কিশোরীটির পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়, তবে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।