দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর গত আট দশকে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি যে সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান সময়ে তা নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। বিশেষ করে গত এক বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রতিটি স্তম্ভকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের হুমকি বা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জোট ভাঙার মতো রাজনৈতিক রীতি লঙ্ঘনের সাহস দেখাননি। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা বিশ্বকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
Table of Contents
নিয়মহীন বিশ্ব ও সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা
সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে ‘নিয়মহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কেবল শক্তির দাপট। ট্রাম্পের প্রভাবে ইউরোপের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ এখন ভাঙনের মুখে। এমনকি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চরম বিভক্তি ও অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দিয়েছে।
শুল্ক যুদ্ধ: বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন মরণফাঁদ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত এবং ইউরোপের দেশ ফ্রান্স মার্কিন শুল্কের খড়গের নিচে পিষ্ট হচ্ছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির জেরে ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি বিশ্ব বাণিজ্যের চিরাচরিত ধারাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব:
| লক্ষ্যবস্তু অঞ্চল/দেশ | বর্তমান ও প্রস্তাবিত শুল্ক | কারণ বা প্রেক্ষাপট |
| ভারত | ৫০০% পর্যন্ত (প্রস্তাবিত) | রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনা ও ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট’। |
| ফ্রান্স | ২০০% পর্যন্ত (হুমকি) | গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন অবস্থানের বিরোধিতা। |
| চীন ও রাশিয়া | জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ শুল্ক | ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য ও বাণিজ্য ভারসাম্য। |
| কানাডা | শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা | উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তিতে টানাপোড়েন। |
মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার অস্থির চিত্র
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গাজায় পুনরায় হামলা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি ওই অঞ্চলকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার তেল ভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সামরিক চাপের কারণে পুরো আমেরিকাস অঞ্চল এখন মার্কিন মাফিয়া ধাঁচের ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
জোটের বিকল্প ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের এই একপাক্ষিক নীতির কারণে তাদের নিকটতম প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশগুলোও এখন বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি চীন সফর করেছেন এবং সরাসরি বলেছেন যে, ভৌগোলিক অবস্থান এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। তিনি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ‘মধ্যম শক্তির’ দেশগুলোকে সাধারণ মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন ভিন্ন ভিন্ন জোট তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।
নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন ও উপসংহার
চীন ও রাশিয়া এখন মার্কিন আধিপত্যমুক্ত একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের ‘আধিপত্যবাদ বিরোধী’ অবস্থান এবং নতুন আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব এটিই প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন একটি নতুন মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থা এতটা ঝাঁকুনি আর কখনো খায়নি, যা বর্তমান সময়কে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
