ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেছেন, নতুন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে দেশের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, দেশের ভেতর থেকেই রাজনীতি করতে হবে। বিদেশে বসে দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আর গ্রহণযোগ্য নয়—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, “লন্ডন, দিল্লি বা পিন্ডিতে বসে আর রাজনীতি করা যাবে না। দেশকে ভালোবাসলে দেশের মানুষের কাছে এসে রাজনীতি করতে হবে।” তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ মিনি স্টেডিয়ামে জামায়াতে ইসলামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘তারুণ্যের উৎসব’ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতাকালে সাদিক কায়েম নতুন প্রজন্মের রাজনীতির রূপরেখা তুলে ধরেন এবং নৈতিকতা ও জনসম্পৃক্ততাকে রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারকে ধারণ করে রাজনীতি করতে হবে। নতুন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে চাইলে দেশের মাটি ও মানুষের ভাষাকে ধারণ করতে হবে। কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করতে হবে।” তাঁর বক্তব্যে রাজনীতিতে নৈতিকতার ঘাটতি এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্বকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সাদিক কায়েম আরও বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাঁর ভাষায়, “৫৪ বছরে আমাদের যে আশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক বিভেদ ও নেতৃত্বের সংকটের কারণে গত ১৭ বছরে দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।” তিনি মনে করেন, বিভক্ত রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দুর্বল করেছে এবং এর ফল ভোগ করেছে সাধারণ মানুষ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, তরুণ সমাজই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। তাই রাজনীতিতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নৈতিক নেতৃত্ব এবং স্বচ্ছ সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বক্তারা আরও বলেন, জনগণের অধিকার রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
এই সমাবেশে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ, সংগঠনটির সাবেক সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন প্রধানসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের জামায়াত নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁরা রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তরুণদের ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাদিক কায়েমের বক্তব্য মূলত প্রবাসকেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা এবং মাঠের রাজনীতিতে ফেরার আহ্বান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের দূরত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ এবং জনসম্পৃক্ততার অভাব নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তাঁর বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিল। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের মুখে এমন বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ধারা নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
সমাবেশে উত্থাপিত বক্তব্যগুলোর সারসংক্ষেপ নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | মূল বক্তব্য |
|---|---|
| রাজনীতির স্থান | দেশের ভেতরে থেকে, জনগণের মাঝে |
| বিদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি | অগ্রহণযোগ্য |
| রাজনৈতিক আদর্শ | ইনসাফ ও ন্যায়বিচার |
| জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক | সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন |
| অতীত মূল্যায়ন | ৫৪ বছরে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি |
| আন্দোলনের সংকট | বিভেদে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন দুর্বল |
| তরুণদের ভূমিকা | নেতৃত্ব ও নৈতিকতার পুনর্গঠন |
সব মিলিয়ে, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে দেওয়া আবু সাদিক কায়েমের বক্তব্য শুধু একটি সমাবেশের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা নতুন প্রজন্মের রাজনীতি, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং দেশের ভেতর থেকেই রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর এই আহ্বান আগামী দিনে রাজনৈতিক আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
