দেশীয় ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্যে উত্থান

এক দশক আগেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির অর্থায়ন প্রধানত বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। দেশীয় ব্যাংকগুলো তখন সীমিত বৈদেশিক মুদ্রা ঋণসীমা, অপর্যাপ্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। কিন্তু গত দশকে ধারাবাহিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল গঠন এবং বৈশ্বিক সমন্বয় সম্পর্ক সম্প্রসারণের ফলে পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে আমদানি নিষ্পত্তি, রপ্তানি অর্থায়ন ও ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানে দেশীয় ব্যাংকগুলোই বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০২৫ সালের শিল্প পরিসংখ্যান এই কাঠামোগত রূপান্তরকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এইচ এস বি সি মোট বাণিজ্য লেনদেনে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে ২০২৫ সালে তাদের লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের ৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। তবে শীর্ষ তিনের মধ্যে দুটি অবস্থান এখন দেশীয় ব্যাংকের দখলে। সিটি ব্যাংক ২০২৫ সালে ৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার লেনদেন সম্পন্ন করেছে, যা আগের বছরের ৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। পূবালী ব্যাংক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন করে শীর্ষ সারিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।

নির্বাচিত ব্যাংকগুলোর তুলনামূলক চিত্র নিচে উপস্থাপিত হলো—

ব্যাংকের নাম২০২৪ (বিলিয়ন ডলার)২০২৫ (বিলিয়ন ডলার)
এইচ এস বি সি৮.৩৩৯.৪২
সিটি ব্যাংক৬.৮০৮.০৭
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড৭.০০৬.৯০
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক৬.১২৬.৮০
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক৭.২৬৬.৫৯
ব্র্যাক ব্যাংক৬.৫৫
ইস্টার্ন ব্যাংক৬.৫৪
ইসলামী ব্যাংক৮.১০৬.৫৪
সাউথইস্ট ব্যাংক৫.৩০৫.৬০

বাংলাদেশের বার্ষিক বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ আনুমানিক ১২০ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার মাত্র ২০টি ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। এতে বোঝা যায়, বাণিজ্য প্রবাহ ধীরে ধীরে অল্পসংখ্যক দক্ষ ও প্রযুক্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

দেশীয় ব্যাংকগুলোর উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাগজবিহীন দলিল ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় অনুবর্তিতা যাচাই, দ্রুত নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং উন্নত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ভাগাভাগি ও কাঠামোবদ্ধ বাণিজ্য অর্থায়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা বৈদেশিক তারল্য প্রবাহে প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করেছে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য প্রতিপক্ষ ঝুঁকি কমিয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লেনদেন প্রবাহকে স্থিতিশীল করেছে।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাণিজ্য এখন উন্মুক্ত হিসাবে সম্পন্ন হয়, যা রপ্তানিকারকদের জন্য অর্থপ্রাপ্তির ঝুঁকি বাড়ায়। আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য ঋণ বিমা বিস্তৃত হলেও দেশে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আধুনিক ঝুঁকি প্রশমন উপকরণ প্রবর্তন এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করা গেলে দেশীয় ব্যাংকগুলো আঞ্চলিক বাণিজ্যে আরও বড় অংশীদারিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হবে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দেশীয় ব্যাংকগুলো আর প্রান্তিক অংশগ্রহণকারী নয়; বরং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য কাঠামোর কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।