ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যপূরণে কতটা সহায়ক হবেন, তা নিয়ে খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি নাটকীয় এক অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী হওয়ার পর রদ্রিগেজ দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, তাঁর দীর্ঘদিনের ‘মাদুরোপন্থী’ অবস্থান এবং রাশিয়া-চীন-ইরান ঘনিষ্ঠতা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই অবিশ্বাসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
ওয়াশিংটনের দাবি ও রদ্রিগেজের অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার নতুন নেতৃত্বের কাছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি জানিয়েছে যেন তারা ইরান, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিশেষ করে এসব দেশের কূটনীতিক ও সামরিক উপদেষ্টাদের ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কার করা ওয়াশিংটনের প্রধান শর্ত। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ওই সব দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি মার্কিন গোয়েন্দাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। রদ্রিগেজ এখন পর্যন্ত পুরোনো মিত্রদের ত্যাগ করার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি।
নিচে ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মার্কিন স্বার্থের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: ভেনেজুয়েলার বৈদেশিক সম্পর্ক ও মার্কিন প্রত্যাশা
| সংশ্লিষ্ট দেশ/পক্ষ | বর্তমান সম্পর্কের ধরন | মার্কিন প্রত্যাশা |
| চীন | ঋণের বিনিময়ে তেল সরবরাহ ও বড় বিনিয়োগ | সম্পর্ক ছিন্ন ও মার্কিন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার |
| রাশিয়া | ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ | সামরিক উপদেষ্টাদের বহিষ্কার ও রুশ প্রভাব খর্ব |
| ইরান | তেল শোধনাগার মেরামত ও কারিগরি সহায়তা | জ্বালানি খাত থেকে ইরানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা |
| যুক্তরাষ্ট্র | অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রদান | তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্য |
সিআইএ প্রধানের সফর ও কূটনৈতিক টানাপড়েন
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত ১৫ জানুয়ারি সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ কারাকাসে গিয়ে দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সরাসরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন আলোচনা ‘ইতিবাচক’, তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর একটি ‘অনিশ্চিত মাধ্যম’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রদ্রিগেজ ইতিমধ্যে কিছু নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন; যেমন তিনি বেশ কিছু রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন। তবে গত রবিবার এক বক্তৃতায় মার্কিন হস্তক্ষেপে নিজের ‘বিরক্তি’ প্রকাশ করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি ওয়াশিংটনের হাতের পুতুল হতে চান না।
মারিয়া কোরিনা মাচাদো: দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প?
মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সক্ষমতা নিয়েও নেতিবাচক মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাচাদোর জনপ্রিয়তা থাকলেও ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা তেল খাতের আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তাঁর কোনো কার্যকর সংযোগ নেই। ফলে এই মুহূর্তে তিনি দেশ পরিচালনায় সক্ষম নন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের সঙ্গে ‘যুক্ত’ দেখতে আগ্রহী। দীর্ঘমেয়াদে রদ্রিগেজ যদি ব্যর্থ হন, তবে মাচাদোকে বিকল্প হিসেবে তৈরি রাখার পরিকল্পনা করছে হোয়াইট হাউস।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও জ্বালানি রাজনীতি
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। যদি রদ্রিগেজ মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তবেই সেখানে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্টদের জন্য বিনিয়োগের দুয়ার খুলবে। তবে রদ্রিগেজকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হলে ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। আপাতত ওয়াশিংটন রদ্রিগেজের ওপর নজর রাখার পাশাপাশি দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও গোপনে যোগাযোগ রাখছে, যাতে যেকোনো সময় পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
