দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মুখে মধ্যপ্রাচ্য: ইরানের পাল্টা আঘাতে রণকৌশল বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলার বিপরীতে তেহরানের অভাবনীয় পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে এক অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা এবং পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানার ঘটনা প্রমাণ করছে যে, শীর্ষ নেতাদের হারিয়েও ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই যুদ্ধ টেনে নেওয়ার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি ও মার্কিন কৌশল

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইতোমধ্যে পেন্টাগনের কাছে অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগের আবেদন করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’র মতে, এই সংঘাত অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেছিল। কাতারভিত্তিক জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ানের মতে, লিবিয়া বা ইরাকের মতো নেতাকে সরিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা ইরানের ক্ষেত্রে খাটেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অবিশ্বাস্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।


পাল্টাপাল্টি হামলার পরিসংখ্যান ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি

ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে চলমান সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

বিষয়ক্ষয়ক্ষতির বিবরণউৎস/তথ্যসূত্র
ইরানে নিহতের সংখ্যা১,২৩০ জন (১৮০টি শিশুসহ)স্থানীয় সংবাদমাধ্যম
ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা (ইরান)৩,৬৪৩টির বেশি বেসামরিক স্থাপনারেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
হামলার শিকার শহরঅন্তত ১৭৪টি শহররেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
মার্কিন ও ইসরায়েলি সেনা১৭ জন নিহত (৬ মার্কিন, ১১ ইসরায়েলি)আইআরজিসি/নিউজ রিপোর্ট
আক্রান্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র১৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

রণক্ষেত্রের বিস্তার: ১৩ দেশে ছড়িয়েছে সংঘাত

ইরানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী আজারবাইজানে ড্রোন হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ এখন ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্থল ও বিমান অভিযান অব্যাহত রয়েছে, যেখানে গত কয়েক দিনেই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ত্রিপোলিতে ইসরায়েলি হামলায় হামাস নেতা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল আলী সস্ত্রীক নিহত হয়েছেন।

বিশ্বশক্তির মেরুকরণ ও পক্ষাবলম্বন

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস তাদের নৌবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সাইপ্রাসের ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলার পর ভূমধ্যসাগরে নৌ-সুরক্ষা বাড়াচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো। এমনকি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া এই যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরব দেশগুলোকে জোরপূর্বক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনছে। মস্কোর মতে, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

রাজনৈতিক সংকটে ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ঝড় তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরুতে দ্রুত বিজয়ের স্বপ্ন দেখালেও এখন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নভেম্বর মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি বা ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থনীতির বদলে যুদ্ধের ব্যয়ভার এবং সেনাসদস্যদের মৃত্যু জনমতকে ট্রাম্পের প্রতিকূলে নিয়ে যেতে পারে।