খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০২৬, ১:১৭ পিএম

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো আয়োজনে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও, তার রেকর্ড করা অডিও বার্তা সাংবাদিকদের সামনে প্রচার করা হয়। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অবৈধ ও সহিংস শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার দাবি, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রহীনতার এক গভীর অন্ধকার সময়ে প্রবেশ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রী ও দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা পরবর্তীতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সম্মেলনের শুরুতেই শেখ হাসিনার অডিও বার্তা বাজানো হয়, যা উপস্থিত দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বক্তব্যের শুরুতেই শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর জাতীয় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।” তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এক বিশাল কারাগার’ এবং ‘মৃত্যুভয়ের আবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই।


তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার বক্তব্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন।
অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা ড. ইউনূসকে একাধিকবার ‘খুনি’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউনূস দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব বিদেশি স্বার্থের কাছে তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
ব্যক্তিগত আক্রমণের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অপসারণ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি, সহিংসতা ও নৈরাজ্যের অবসান, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধ করা।
সবশেষে গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান তিনি। তার ভাষায়, “সত্য উদঘাটন ছাড়া জাতির পুনর্মিলন কখনোই সম্ভব নয়।”
এনডিটিভি মন্তব্য করেছে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান গভীর বিভাজনেরই প্রতিফলন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।
মন্তব্য