দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা—সংক্ষেপে আর.পি. সাহা। সংগ্রামী, আত্মনির্ভর, হৃদয়বান মানবসেবক। দারিদ্র্যের মাটি থেকে উঠে এসে যিনি নিজের শ্রম, মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে হয়েছেন এশিয়াব্যাপী পরিচিত দানবীর।
তিথি অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৬ নভেম্বর ১৮৯৬, উত্থান একাদশীর পুণ্যপ্রভাতে, টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে।
মাতা কুমুদিনী সাহা, পিতা দেবেন্দ্রনাথ সাহা।
শৈশবের বেদনা থেকেই মানবসেবার প্রতিজ্ঞা
সাত বছর বয়সে মায়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু—এই অপূরণীয় বেদনা রণদার শিশু-মনে গেঁথে যায় গভীর ক্ষতের মতো। তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন—একদিন সামর্থ্য হলে চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
মায়ের মৃত্যুর পর বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, দারিদ্র্যের কষাঘাত, সৎ মায়ের অবহেলা—সব মিলিয়ে অনাদরেই বেড়ে ওঠা। কখনো না খেয়ে থাকা, কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে খাওয়া, আবার কখনো দিনমজুরের কাজ—এই কঠিন বাস্তবতাই তাঁর চরিত্রকে কঠোর করে তোলে।
কর্মজীবনের সংগ্রাম থেকে সাফল্যের শিখরে
মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগ দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ৩৮ জন সেনাসদস্যকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করে তিনি বহু মহলে প্রশংসা কুড়ান।
পরবর্তীতে জর্জ ভি নামের এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় রেলওয়েতে টিটিই হিসেবে যোগ দিলেও ষড়যন্ত্রে পড়ে চাকরি হারাতে হয়। কিন্তু থেমে থাকেননি। কিছু সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ১৯৩২ সালে কলকাতায় লবণ ও পরে কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। সেখান থেকেই তাঁর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ।
ব্যবসায় সাফল্য পেয়ে তিনি ‘বেঙ্গল রিভার’ নামে একটি জাহাজ ক্রয় করেন। পরে নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় তিনটি পাওয়ার হাউজ কেনেন। এরপর পাট বেল তৈরির কারখানা, লেদার ব্যবসা—সব মিলিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
উৎসর্গিত জীবন—নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ এলাকায় ফিরে এসে ১৯৩৮ সালে লৌহজং নদীর তীরে প্রতিষ্ঠা করেন দাতব্য চিকিৎসালয়, যা পরবর্তীতে ৭৫০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কুমুদিনী হাসপাতালে পরিণত হয়।
দারিদ্র্যের কারণে নিজে শিক্ষার সঠিক সুযোগ না পেলেও নারীশিক্ষার উন্নয়নে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতেশ্বরী হোমস—দেশের অন্যতম সেরা আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
পরে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী নার্সিং স্কুল, কুমুদিনী কলেজ, দেবেন্দ্রনাথ কলেজ, মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, এস.কে. পাইলট স্কুলসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
জীবনে অর্জিত বিপুল সম্পদ নিজ ভোগে না খরচ করে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল—যার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কল্যাণ এবং মানবিক উন্নয়ন।
বর্তমানে তাঁর নাতি রাজীব প্রসাদ সাহা এই ট্রাস্টের অধীনে পরিচালনা করছেন কুমুদিনী মহিলা মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফটসহ বহু প্রতিষ্ঠান।
শিল্প-সংস্কৃতিপ্রেমী এই দানবীর কুমুদিনী চত্বরে নিয়মিত আয়োজন করতেন যাত্রাপালা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—যেখানে তিনি নিজেও অভিনয় করতেন।
১৩৫০ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরে তিনি খুলেছিলেন লঙ্গরখানা—হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছিল তার উদ্যোগে।
১৯৭১—অন্ধকার দিন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৭ মে, পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশিয় দোসর আলবদর, রাজাকাররা রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা রবিকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর আর তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বাঙালির ইতিহাসে এই অপূরণীয় ক্ষতি চিরদিন বেদনার হয়ে থাকবে।
চির অমর এই মানবপ্রেমী
রণদা প্রসাদ সাহার গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজও তাঁর মানবিক দর্শন ও ত্যাগের সাক্ষ্য বহন করছে। হাজারো মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানের অবলম্বন হয়ে আছে তাঁর সৃষ্টি প্রতিষ্ঠানগুলো। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মানবতার আলোকবর্তিকা।
তিনি নেই—কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর দানশীলতা বাংলার সমাজে চিরদিন আলো ছড়াবে।
এসএস
