বাংলাদেশের ট্রেজারি বিল (টি-বিল) বাজারে রোববার তুলনামূলক স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজার হস্তক্ষেপের ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বেড়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে স্বল্পমেয়াদি সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহারে। সাপ্তাহিক নিলামে বিভিন্ন মেয়াদের টি-বিলের কাট-অফ ইয়িল্ড সামান্য কমেছে অথবা স্থিতিশীল রয়েছে—যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর চাপের তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
রোববার অনুষ্ঠিত নিলামে সরকার ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের মেয়াদে মোট ৭০ বিলিয়ন টাকার টি-বিল ইস্যু করে। ফলাফলে দেখা যায়, ৯১ দিনের ও ৩৬৪ দিনের টি-বিলের ইয়িল্ড আগের সপ্তাহের তুলনায় এক পয়েন্ট করে কমেছে, আর ১৮২ দিনের টি-বিলের সুদহার অপরিবর্তিত রয়েছে। ব্যাংকারদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা দুর্বল থাকায় এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ নিরাপদ সরকারি কাগজে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
এই তারল্য বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ডলার কেনাকাটা। রোববার আন্তঃব্যাংক স্পট মার্কেটে মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ১১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের কাট-অফ দর নির্ধারিত হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। ডলার কেনার বিপরীতে টাকার যোগান বাড়ায় ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের চাপ কমেছে এবং স্বল্পমেয়াদি সুদহারের ওপর নিম্নমুখী প্রভাব পড়েছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকায় ঋণ বিতরণের গতি মন্থর। তার ভাষায়, “এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকিমুক্ত ও স্থিতিশীল রিটার্ন দেওয়ায় টি-বিল ব্যাংকগুলোর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.২৩ শতাংশে, যেখানে আগের মাসে তা ছিল ৬.২৯ শতাংশ। এই নিম্নমুখী ধারা সামগ্রিক অর্থনীতিতে সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ১৩ জুলাই থেকে চালু মুক্ত ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত মোট ৩.০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, রেমিট্যান্স প্রবাহে সহায়তা করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্যচাপ কমানো।
ডলার কেনাকাটার ইতিবাচক প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও দেখা যাচ্ছে। ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রচলিত হিসাবপদ্ধতিতে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৮০ বিলিয়ন ডলারে, যা দুই দিন আগে ছিল ৩২.৭২ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের BPM6 পদ্ধতিতে একই সময়ে রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ২৮.১১ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকারদের ধারণা, সামনে যদি তারল্য পরিস্থিতি এমনই অনুকূল থাকে এবং বেসরকারি ঋণচাহিদা শক্তিশালী না হয়, তাহলে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহার নিকট ভবিষ্যতেও নরম ধারায় থাকতে পারে।
সংক্ষিপ্ত চিত্র
| সূচক | সর্বশেষ | আগের |
|---|---|---|
| ৯১ দিনের টি-বিল ইয়িল্ড | ১০.৫২% | ১০.৫৩% |
| ১৮২ দিনের টি-বিল ইয়িল্ড | ১০.৬৫% | ১০.৬৫% |
| ৩৬৪ দিনের টি-বিল ইয়িল্ড | ১০.৭১% | ১০.৭২% |
| ইস্যুকৃত টি-বিল | ৭০ বিলিয়ন টাকা | — |
| দৈনিক ডলার ক্রয় (বাংলাদেশ ব্যাংক) | ১১৫ মিলিয়ন ডলার | — |
| মোট ডলার ক্রয় (১৩ জুলাই থেকে) | ৩.০৫ বিলিয়ন ডলার | — |
| মোট রিজার্ভ (প্রচলিত) | ৩২.৮০ বিলিয়ন ডলার | ৩২.৭২ বিলিয়ন ডলার |
| রিজার্ভ (IMF BPM6) | ২৮.১১ বিলিয়ন ডলার | ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলার |
সব মিলিয়ে বলা যায়, পর্যাপ্ত তারল্য, দুর্বল ঋণপ্রবাহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বয়েই বর্তমানে ট্রেজারি বিল বাজারে নরম সুদহারের প্রবণতা বজায় রয়েছে।
