বাংলাদেশে বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় চার কোটি চব্বিশ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান জাতীয় খাদ্যভান্ডারের প্রায় ষাট শতাংশ পূরণ করে। হাওর অঞ্চল থেকে আসে মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার হাওর থেকে একাই প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন ধান জাতীয় খাদ্যভান্ডারে যুক্ত হয়। তবে ফাল্গুন থেকে বৈশাখ পর্যন্ত অকাল ও অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের ফসল বারবার তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলায় বিস্তৃত হাওর অঞ্চল দেশের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় নয় দশমিক তেষট্টি লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক জমির ধান এখনো সম্পূর্ণ কাটা হয়নি এবং কাটা ধান শুকানোর সুযোগও মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে মাড়াই ও শুকানোর খোলা জায়গায় রাখা ধানে অঙ্কুরোদ্গম শুরু হয়েছে, ফলে ফসল নষ্ট হচ্ছে।
Table of Contents
বৃষ্টিপাত ও হাওর তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা
নিচে সাম্প্রতিক ও ঐতিহাসিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার তথ্য উপস্থাপন করা হলো—
| বছর | স্থান | বৃষ্টিপাতের পরিমাণ | ঘটনা |
|---|---|---|---|
| ১৯০৪ | সুনামগঞ্জ | প্রায় ২১০ ইঞ্চি | ঐতিহাসিক অতিবৃষ্টি |
| ১৯৫৯ | সিলেট অঞ্চল | ৩৩৬ মিলিমিটার | এক দিনের ভারী বৃষ্টি |
| ২০০০ | সিলেট অঞ্চল | ৩৬২ মিলিমিটার | রেকর্ড বৃষ্টিপাত |
| ২০২২ | সুনামগঞ্জ–সিলেট | ২৮২ মিলিমিটার (এক দিন) | ব্যাপক জলাবদ্ধতা |
| ২০২৪ | সিলেট | ২২০ মিলিমিটার (কয়েক ঘণ্টায়) | আকস্মিক বৃষ্টি |
এই অঞ্চলে বৃষ্টিপ্রবণতা অত্যন্ত বেশি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
হাওরের সংকটের তিনটি স্তর
হাওর অঞ্চলের সংকটকে তিনটি প্রধান স্তরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—
প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে সীমানা বিরোধ, জমি দখল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনাগত অনিয়ম।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে জলাভূমি, নদী ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, উজান অঞ্চলের বন উজাড়, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাব।
জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির কারণ
হাওরের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ নদী, বিল ও জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়া। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাটি উত্তোলন ও বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিপুল পরিমাণ মাটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জলাধার ভরাটের সমান প্রভাব ফেলছে।
কৃষি উৎপাদন ও সংকট
হাওরের কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল ধান জাত ব্যবহার করলেও এসব জাত অকাল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। অন্যদিকে ঐতিহ্যগত গভীর পানির ধানের জাতগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের অসামঞ্জস্যের কারণে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এক কেয়ার জমি চাষে গড়ে পনেরো হাজার টাকা খরচ হয়, কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করে কৃষকের লাভ থাকে খুব সীমিত বা প্রায় শূন্য।
শ্রম ও ফসল সংগ্রহ সমস্যা
হাওরে শ্রমিক সংকট বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধান কাটার জন্য প্রচলিত ভাগাভাগি পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। জলাবদ্ধ জমিতে যন্ত্রচালিত ধান কাটার মেশিনও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
উপসংহারমূলক তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ
হাওরের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, কৃষি ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। নদী ও বিল খনন, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বারবার উঠে আসছে।