বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক বিস্ফোরক ঘোষণার মাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার নির্বাচনী সমঝোতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই এনসিপির অংশ হচ্ছেন না। রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি তাঁর এই অবস্থান পরিষ্কার করেন। জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির এই নেতার সরে দাঁড়ানো এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন বড় ধাক্কা, তেমনি এটি দলটির আদর্শিক লক্ষ্য নিয়েও জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
মাহফুজ আলম তাঁর বক্তব্যে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে তাঁকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি ব্যক্তিগত লাভ বা ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও নীতিগত অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা ছিল না। বরং এনসিপিকে তিনি একটি স্বতন্ত্র এবং শক্তিশালী ‘জুলাই আমব্রেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে কোনো প্রকার আপস ছাড়াই নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটবে। কিন্তু নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে মাহফুজ আলম বর্তমান সময়কে ইতিহাসের একটি ‘শীতল যুদ্ধের’ পর্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই অস্থির সময়ে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে রাজনীতিতে নামার চেয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র নীতি ও বক্তব্যে অটল থাকা অনেক বেশি জরুরি। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত, সাংস্কৃতিক লড়াই এবং দায়-দরদের সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, বর্তমান এনসিপি সেই লক্ষ্যগুলো যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছে কি না, তা নিয়ে তাঁর গভীর সংশয় রয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, জুলাই শক্তির সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে এক নতুন রাজনৈতিক বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
উপদেষ্টা পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর মাহফুজ আলম এখন নিজেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সামনের দিনগুলোতে তিনি সামাজিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা এবং নতুন অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের পক্ষে কাজ করে যাবেন। যারা তাঁর এই স্বতন্ত্র অবস্থানের সাথে একমত হবেন, তাঁদের নিয়ে তিনি একটি বিকল্প রাজনৈতিক পথচলা শুরু করতে আগ্রহী। এনসিপি থেকে তাঁর এই দূরত্ব বজায় রাখা মূলত ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মূল স্পিরিটকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখার একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষক মহলে আলোচিত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে একটি বিকল্প এবং মধ্যপন্থী তরুণ শক্তির উত্থান এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
