ড. ইউনূসের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণার গেজেট ও এসএসএফ সুবিধা নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারায় সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে নতুন এক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে একটি গেজেট জারি করেছিলেন। তবে রহস্যাবৃত বিষয় হলো, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব গেজেট বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে থাকার কথা থাকলেও, এই বিশেষ প্রজ্ঞাপনটি এখন আর সেখানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

গেজেট উধাও ও সরকারি ভাষ্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূসকে এক বছরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সাধারণত স্বচ্ছতার খাতিরে সব ধরনের সরকারি আদেশ বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের (বিজি প্রেস) ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু এই গেজেটটি সরিয়ে ফেলার বিষয়ে বিজি প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পালন করেছেন মাত্র। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থার গোপনীয়তার অনুরোধে গেজেট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লা পান্না এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা তিনি পরবর্তীতে গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিতও করেছেন।

এসএসএফ নিরাপত্তা বিধিমালার আইনি ভিত্তি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার শাসনামলেই ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) আইন ২০২১’-এর ক্ষমতা বলে নতুন একটি নিরাপত্তা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালা অনুযায়ী সাবেক সরকার প্রধান বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা লাভের অধিকারী হন।

নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫-এর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

বিষয়বিবরণ ও কার্যকারিতা
নিরাপত্তার মেয়াদদায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী ১ বছর।
নিরাপত্তা প্রদানকারী সংস্থাস্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)।
আবাসিক নিরাপত্তাস্থায়ী ও অস্থায়ী বাসভবন এবং কার্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাঅগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো দুর্ঘটনায় এসএসএফ ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়।
অস্ত্র বহন সংক্রান্ত বিধিসাদা পোশাকে কেবল বাহিনীর কর্মকর্তাই অস্ত্র বহন করতে পারবেন; অন্যদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ।
প্রবেশ নিয়ন্ত্রণবাসভবন ও অনুষ্ঠানস্থলে দর্শনার্থী ও যানবাহনের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

নজির ও আত্মপক্ষ সমর্থন

ড. ইউনূসের তৎকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টিকে ‘প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, আনুষ্ঠানিক গেজেট বা আদেশ ছাড়া এসএসএফ কোনো সাবেক সরকার প্রধানকে সুরক্ষা দেয় না। এর সপক্ষে তিনি ২০০১ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানও দায়িত্ব ছাড়ার আগে একই ধরণের আদেশ জারি করেছিলেন। ফলে এটি কোনো আইন লঙ্ঘন বা অনৈতিক সুবিধা নয় বরং একটি প্রচলিত প্রশাসনিক ধারা।

বর্তমান পরিস্থিতি

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ গ্রহণ করলে ড. ইউনূসের মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি তার সরকারি বাসভবন ছেড়ে ব্যক্তিগত ঠিকানায় চলে যান। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, তিনি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসএসএফ-এর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকবেন। তবে গেজেটটি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তার বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গেজেট বা সরকারি আদেশের গোপনীয়তা বিতর্কের সুযোগ তৈরি করে।