রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের প্রবেশদ্বারে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে যে পৈশাচিক ঘটনার উন্মোচন হয়েছে, তা কেবল রাজধানীবাসীকে নয়, পুরো দেশকেই স্তম্ভিত করে দিয়েছে। পরিত্যক্ত নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪২ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মো. আশরাফুল হকের ২৬ খণ্ড করা মরদেহ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রহস্য উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যেই শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে নিহতের দীর্ঘদিনের বন্ধুকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার বিবরণ ও মরদেহের পরিচয় শনাক্ত
গত ১৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের পানির পাম্প সংলগ্ন ফুটপাতে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি প্লাস্টিকের ড্রাম পড়ে থাকতে দেখেন পথচারীরা। ড্রামগুলো থেকে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। শাহবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ড্রাম খুলে কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় মানুষের দেহাংশ খুঁজে পায়। পুলিশ জানিয়েছে, একটি ড্রামে চাল থাকলেও অন্যটিতে ছিল খণ্ড-বিখণ্ড মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ।
প্রাথমিকভাবে নিহতের পরিচয় জানা না গেলেও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। প্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, নিহত ব্যক্তির নাম মো. আশরাফুল হক। তাঁর গ্রামের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপাড়ায়। তাঁর পিতার নাম মো. আব্দুর রশীদ। আশরাফুল মূলত একজন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি ভারত ও মিয়ানমার থেকে আলু ও পেঁয়াজ আমদানির সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছিলেন।
মামলার ইতিবৃত্ত ও প্রধান আসামি
এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) সকালে নিহতের বোন আনজিনা বেগম বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আশরাফুল হকের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু জরেজ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালিদ মনসুর জানান, নিহত আশরাফুল গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। এরপর বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত পরিবারের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল, কিন্তু এরপর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ‘হানিট্র্যাপ’ ও পরকীয়া বিতর্ক
র্যাব ও ডিবির প্রাথমিক তদন্তে এই খুনের নেপথ্যে ভয়াবহ কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, আশরাফুলকে মূলত ‘হানিট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করা হয়েছিল। প্রধান আসামি জরেজ মিয়া তাঁর প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনূরকে ব্যবহার করে আশরাফুলকে রাজধানীর দনিয়া এলাকার একটি বাসায় ডেকে নেন। সেখানে তাঁকে জিম্মি করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
তবে তদন্তের আরেকটি দিক বলছে, এই হত্যাকাণ্ডটি একটি ত্রিভুজ প্রেমের করুণ পরিণতি। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, জরেজুলের প্রেমিকা শামীমার সাথে আশরাফুলও কোনো এক সময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। জরেজুল তা জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। গত ১২ নভেম্বর দনিয়ার ওই বাসায় আশরাফুলকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর প্রমাণ লোপাটের জন্য তাঁর দেহকে ধারালো অস্ত্র ও করাত দিয়ে ২৬টি টুকরো করা হয়।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বর্তমান অবস্থা
নিচে উক্ত হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী তদন্তের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র সারণি আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহতের নাম ও পেশা | মো. আশরাফুল হক (৪২), আমদানিকারক ব্যবসায়ী। |
| স্থায়ী ঠিকানা | গোপালপাড়া, বদরগঞ্জ, রংপুর। |
| মরদেহের অবস্থা | ২৬টি খণ্ডে বিভক্ত, ড্রামবন্দি। |
| মরদেহ উদ্ধারের স্থান | জাতীয় ঈদগাহ মাঠের প্রবেশপথ, হাইকোর্ট এলাকা। |
| প্রধান আসামি | জরেজুল ইসলাম ওরফে জরেজ (নিহতের বন্ধু)। |
| সহযোগী আসামি | শামীমা আক্তার কোহিনূর (জরেজের প্রেমিকা)। |
| হত্যার সম্ভাব্য কারণ | মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা ও পরকীয়া জনিত বিরোধ। |
| আইনি পদক্ষেপ | শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের ও আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুর। |
শোকাতুর পরিবার ও বিচারপ্রার্থনা
ব্যবসায়ী আশরাফুলের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে রংপুরের বদরগঞ্জে তাঁর নিজ গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের ১০ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান এবং ৭ বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবা-মা। নিহতের বোন আনজিনা বেগম বলেন, “আমার ভাই সরল বিশ্বাসে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু সেই বন্ধুই যে কালনাগিনী শামীমাকে নিয়ে ভাইকে এভাবে কসাইয়ের মতো কেটে ফেলবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা ঘাতকদের ফাঁসি চাই।”
তদন্তের গতিপ্রকৃতি
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুনিরা একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে ড্রাম দুটি নিয়ে এসেছিল। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে জনাকীর্ণ এলাকায় ড্রামগুলো ফেলে চম্পট দেয়। পুলিশ ও র্যাব যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জরেজ ও শামীমাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে।
পরিশেষে, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর দেহ এভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া আমাদের সামাজিক নৈতিকতা ও নিরাপত্তার সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তুচ্ছ স্বার্থ বা ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে মানুষের জীবন নেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
