দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছেন। জায়গার সংকটে অনেককে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একই শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
এর মধ্যেই চলতি বছর এক দিনে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন। একই সময়ে মারা গেছেন আটজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১৫৭ জন। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৬০ জনের। ফলে মাসের মাঝামাঝি সময়েই মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া আটজনের মধ্যে তিনজন চট্টগ্রাম বিভাগের, চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
মুগদা হাসপাতালে শয্যার চেয়ে কয়েক গুণ রোগী
রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিস্থিতি ডেঙ্গুর বাড়তি চাপের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ৬০টি। অথচ সোমবার সেখানে ভর্তি ছিলেন ১৮৭ জন। শয্যা না পেয়ে অনেকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দেখা গেছে, নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগীদের রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে একটি শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ওষুধ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
মুগদা জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।
শুধু হাসপাতালের ভেতরেই নয়, রোগীদের স্বজনদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। শয্যা খুঁজতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে অনেককে।
রাজধানীর মাতুয়াইলের বাসিন্দা নুরজাহান বেগমের ২০ বছর বয়সী নাতনি জাহিন এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছেন। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করেন স্বজনরা। তিন-চারটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত জাহিনকে মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেও শয্যা না থাকায় মেঝেতে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
নুরজাহান বেগম বলেন, তাঁরা অনেক হাসপাতালে ঘুরেছেন, কিন্তু কোথাও শয্যা পাননি।
ঢাকার বাইরেও বাড়ছে চাপ
ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৭৩৩ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১ জন এবং ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৩৮৮ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩ জন, খুলনা বিভাগে ৩০২ জন, ময়মনসিংহে ১১০ জন, রাজশাহীতে ১৪৫ জন, রংপুরে ৮৬ জন এবং সিলেটে সাতজন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৩ হাজার ৫৭০ জনের মধ্যে ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ২৮২ জন।
আগস্টে চলতি বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬। একই মাসে মৃত্যু হয় ৪৩ জনের। সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে ৬০ জনের মৃত্যু হওয়ায় সংক্রমণের বর্তমান গতি নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির হার দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালকে স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগী চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো সরকারি হাসপাতালে শয্যা বা চিকিৎসাসুবিধার সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শয্যা বা সুযোগ-সুবিধার সংকট হলে প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানো হবে। হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুধু রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না; ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকাগুলোতে উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই চিকিৎসা নিশ্চিত করাই স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য।
অক্টোবরে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা
বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই অক্টোবর নিয়ে নতুন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, তাঁর পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এডিস মশা রাতেও কামড়ায়।
শীতের সময়ে কিউলেক্স মশা বেশি দেখা গেলেও এডিস মশা তুলনামূলক কম চোখে পড়ে। এ কারণে অনেক মানুষ এডিস মশার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেন না। অধ্যাপক কবিরুল বাশার মশার আচরণ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশে ১২৬ প্রজাতির মশা রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আট প্রজাতির মশার কলোনি রয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এডিস মশার প্রজনন ও আচরণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
একই অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই সহজ নয়। তাঁর মতে, রোগটির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শুধু শয্যা বাড়িয়ে সমাধান হবে না
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে সাময়িকভাবে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ডেঙ্গুর মূল উৎস নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে না।
তিনি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত ও কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত রোগী শনাক্ত এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হলেও শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার কাজ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
আগের বছরগুলোর তুলনায় বড় চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। ওই বছর মারা যান ৪১৩ জন।
২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। এর আগের বছর ২০২৩ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
চলতি বছরের পরিস্থিতি এখনো আগের ভয়াবহ বছরগুলোর পর্যায়ে না পৌঁছালেও সেপ্টেম্বরের দ্রুত বাড়তে থাকা মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির হার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা যুক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যা ও জনবল বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়লেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নির্ভর করছে এডিস মশার বিস্তার কমানো এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর স্থানীয় উদ্যোগের ওপর। এখন সামনে বড় প্রশ্ন হলো, অক্টোবরের সম্ভাব্য চাপ সামলাতে স্বাস্থ্য ও স্থানীয় প্রশাসন কতটা প্রস্তুত থাকতে পারে।









