ডাইনি অপবাদে মা ও শিশুর মৃত্যুর ঘটনা

ঝাড়খণ্ড রাজ্যের কুদসাই গ্রামে এক মা ও তার ১০ মাসের শিশুকে ডাইনি অপবাদে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। ৩২ বছর বয়সী জ্যোতি সিংকু ও তার শিশুকে মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় হামলাকারীরা তাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিহত জ্যোতির স্বামী কোলহান সিংকুও গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ আরও জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজছে।

ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুদসাই গ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত। গ্রামের মাটির প্রায় ৫০টি ঘরে সাধারণত শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন হয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে গ্রামে কয়েকটি গবাদিপশুর আকস্মিক মৃত্যু ও স্থানীয় বাসিন্দা পুস্টুন বিরুয়ার অসুস্থতা এবং মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই গুজব থেকে উত্তেজনা তৈরি হয়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।

পুস্টুনের স্ত্রী জানো বিরুয়া জানান, তার স্বামী বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সমস্যায় ভুগছিল। গ্রামের কোনো প্রশিক্ষিত ডাক্তার না থাকায় তারা একজন হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ওই চিকিৎসক পুস্টুনের শরীরে কোনো দৃশ্যমান রোগ না থাকায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না দেখান। জানো বলেন, “আমরা এত গরিব, এত দূরে হাসপাতালে নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না।”

গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বলা হয় যে, জ্যোতি সিংকু জাদুটোনা বা ডাইনিবিদ্যা চর্চা করছেন এবং পুস্টুনের অসুস্থতার জন্য তিনি দায়ী। মঙ্গলবার রাতে প্রায় ১২ জনের একটি দল, যার মধ্যে পাঁচজন নারীও ছিলেন, জ্যোতি ও তার শিশুর বাড়িতে ঢুকে তাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

কোলহান সিংকু হাসপাতালে শুয়ে বলেন, “আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলাম, বিষয়টি গ্রামের পঞ্চায়েত বা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা হোক। কিন্তু তারা আমার কোনো কথা শোনেনি।”

পুলিশ হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করেছে এবং হামলায় জড়িত অন্যদের ধরতে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এছাড়া গ্রামে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ প্রচার ও কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভারতে জাদুবিদ্যা বা ডাইনিবিদ্যার সন্দেহে ২,৫০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই নারী।

সাম্প্রতিক কুসংস্কারের কারণে হত্যার পরিসংখ্যান (ভারতে ২০০০–২০১৬)

বছরহত্যার ঘটনানারী নিহতশিশু নিহতমন্তব্য
২০০০–২০০৫১,০০০+৭০০+৩০+প্রাথমিক ভাবে স্থানীয় গুজব
২০০৬–২০১০৮০০+৬০০+২০+গ্রামীণ এলাকায় বেশি
২০১১–২০১৬৭০০+৫৫০+১৫+কুসংস্কার ও অপবাদ মূল কারণ

ঘটনাটি গ্রামীণ ভারতীয় সমাজে কুসংস্কারের দিক থেকে উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামে শিক্ষার অভাব, চিকিৎসা পরিষেবার অপ্রতুলতা এবং অতিরিক্ত বিশ্বাস গুজবকে সহিংসতায় রূপ দিতে পারে।

এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় প্রশাসন ও জনসাধারণের জন্য একবারে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যাতে গ্রামীণ অঞ্চলে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়।