বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী সোহেল রানা আজ ৭৯ বছরে পদার্পণ করলেন। ১৯৪৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্ম নেওয়া তাঁর প্রকৃত নাম মাসুদ পারভেজ। শিল্প, সাহস ও স্বপ্ন—এই তিনের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা তাঁর জীবন যেন এক চলমান ইতিহাস।
মুক্তিযুদ্ধ ও চলচ্চিত্রে অবদান
সোহেল রানা মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে দেশের জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সেই দেশপ্রেম ও সাহসিকতার অনুপ্রেরণায় তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রযোজিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ওরা ১১ জন আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে সমাদৃত।
১৯৭৩ সালে কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন-এর সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত মাসুদ রানা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ‘মাসুদ রানা’ নামটি যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই মিশে যায়—দুঃসাহসী, রোমাঞ্চপ্রিয় এবং আত্মবিশ্বাসী এক নায়ক।
শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নন, প্রযোজনা ও পরিচালনাতেও তিনি রেখেছেন অসাধারণ স্বাক্ষর। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ—এপার ওপার চলচ্চিত্রে কলকাতার অভিনেত্রী সোমা মুখার্জীকে নায়িকা হিসেবে নিয়ে আসা, যা সময়ের সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত।
নিচের টেবিলে তাঁর প্রধান চলচ্চিত্র ও অর্জিত স্বীকৃতিসমূহ তুলে ধরা হলো:
| চলচ্চিত্রের নাম | ভূমিকা/অবদান | স্বীকৃতি/বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| ওরা ১১ জন | প্রযোজক | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ইতিহাসচিত্র |
| মাসুদ রানা | প্রধান চরিত্র | জনপ্রিয় ও কিংবদন্তি চরিত্র |
| এপার ওপার | পরিচালক/প্রযোজক | কলকাতার নায়িকাসহ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ |
| গোপন কথা, দোস্ত দুশমন | অভিনেতা | নান্দনিক অভিনয় |
| মিন্টু আমার নাম | অভিনেতা | সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন |
| জীবন নৌকা, রাজরানী | অভিনেতা | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত |
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন।
রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন
ছাত্রজীবনে সোহেল রানা ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা, ছাত্রলীগের সঙ্গে সক্রিয়। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও যুক্ত হন। ২০০৯ সালে জাতীয় পার্টি-তে যোগ দিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর নির্বাচন বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৯০ সালে তিনি ডা. জিনাত-কে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্র মাশরুর পারভেজ জিবরাস।
সোহেল রানার জীবন ও কর্মকাণ্ড—শিল্পীসত্তা, দেশপ্রেম, সাহস এবং ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার অনন্য সংমিশ্রণ। আজকের বিশেষ দিনে আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করি। বাংলা চলচ্চিত্রের এই জীবন্ত কিংবদন্তি আরও অনেক দিন আমাদের মাঝে থেকে তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে আলোকিত করুন।
