কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গুলিতে হাসান আহমদ (৪৫) নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ তারিখ রাত ১০টার দিকে নয়াপাড়া ক্যাম্পের এইচ ব্লকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত হাসান আহমদ ওই শিবিরের এইচ ব্লকের ৬৩৪ নম্বর শেডের বাসিন্দা সুলতান আহমদের ছেলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হাসান আহমদ ওই এলাকার অপরাধী চক্র ‘জাকির বাহিনী’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিবরণ
পুলিশ ও স্থানীয় রোহিঙ্গা সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়শিবিরে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখা, মসজিদ কমিটির নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বশত্রুতার জের ধরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘সাদ্দাম বাহিনী’ এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। ঘটনার দিন রাতে মসজিদ কমিটি গঠন সংক্রান্ত আলোচনার কথা বলে পাশের মুচনী রেজিস্টার্ড ক্যাম্প কমিটির এক সদস্য হাসান আহমদকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যান। হাসান আহমদ যখন নয়াপাড়া শিবিরের এইচ ব্লকে পৌঁছান, তখন সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা ৬ থেকে ৭ জন সশস্ত্র ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ শুরু করে।
গুলির আঘাতে হাসানের বুকের ডান পাশে গুরুতর জখম হয়। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তাঁকে দ্রুত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত হাসান আহমদের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলাসমূহ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি অনুযায়ী, নিহত হাসান আহমদ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলাগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| মামলার ধরন | মামলার সংখ্যা |
| অস্ত্র আইন সংক্রান্ত মামলা | ৩টি |
| ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা | ২টি |
| অপহরণ সংক্রান্ত মামলা | ২টি |
| মোট মামলার সংখ্যা | ৭টি |
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও পদক্ষেপ
১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক মোহাম্মদ কাউছার সিকদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, সাদ্দাম বাহিনীর সদস্যরা পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে আশ্রয়শিবিরে ঢুকে এই হামলা চালায়। হামলা সম্পন্ন করার পরপরই সন্ত্রাসীরা পুনরায় পাহাড়ের গহিন অরণ্যে আত্মগোপন করে। এই ঘটনায় আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী জানিয়েছেন, ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে শিবিরের পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ
আশ্রয়শিবিরের একজন রোহিঙ্গা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের পর শিবিরের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কায় সাধারণ রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে শিবিরের অপরাধী গোষ্ঠীগুলো মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অন্তত ৯টি সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যারা নিয়মিত মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে। চলতি মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন শিবিরে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ মে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলিতে একজন আহত হন এবং ৫ ও ৬ মে পৃথক হামলায় দুই রোহিঙ্গা নেতা প্রাণ হারান। আধিপত্য বিস্তারের এই ধারাবাহিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
