টানা দুই মাসে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয়

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে সুবাতাস বইছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।

অক্টোবর মাসের পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে যে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার এসেছে, তা গত বছরের একই মাসের (অক্টোবর ২০২৩) ২৩৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। শুধু অক্টোবর নয়, রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা সেপ্টেম্বর মাস থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে দেশে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে একক মাসে অন্যতম সর্বোচ্চ আয়। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিকতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।

ব্যাংকভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র

রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো শীর্ষস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেও আয়ের একটি বড় অংশ দেশে প্রবেশ করেছে। অক্টোবর মাসের ব্যাংকভিত্তিক আয়ের চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

  • বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক: ১৮৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার।

  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক: ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার।

  • বিশেষায়িত ব্যাংক (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক): ২৪ কোটি ডলার।

  • বিদেশি ব্যাংক: ৬৬ লাখ ডলার।


২০২৪–২৫ অর্থবছরের রেমিট্যান্স চিত্র ও রিজার্ভের অবস্থা

অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্সের প্রবাহ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। নিচে একটি সারণির মাধ্যমে গত কয়েক মাসের তথ্য ও রিজার্ভের প্রভাব তুলে ধরা হলো:

মাস/সময়কালরেমিট্যান্সের পরিমাণ (মার্কিন ডলার)প্রবৃদ্ধির প্রভাব ও রিজার্ভ
জুলাই ২০২৪২৪৭ কোটি ৮০ লাখঅর্থবছরের শুরুতে শক্তিশালী সূচনা।
আগস্ট ২০২৪২৪২ কোটি ১৮ লাখধারা বজায় রেখে প্রবৃদ্ধি সচল।
সেপ্টেম্বর ২০২৪২৬৮ কোটি ৫৮ লাখবছরের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়।
অক্টোবর ২০২৪২৫৬ কোটি ৩৪ লাখটানা দ্বিতীয় মাসে আড়াই বিলিয়নের ঘর অতিক্রম।
অর্থবছরের মোট আয়৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশিগত অর্থবছরের তুলনায় ২৭% প্রবৃদ্ধি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ৩২ বিলিয়ন ডলার+আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন উৎসাহমূলক পদক্ষেপ এবং ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত প্রবাসীদের উৎসাহিত করেছে। এছাড়া প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স বন্ড এবং বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচিও এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ৩২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এটি দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো বিশেষ করে জ্বালানি তেল, সার এবং খাদ্যশস্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে বড় ধরণের নিরাপত্তা দিচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট অনেকটা প্রশমিত হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন এলসি (ঋণপত্র) খোলার সক্ষমতা ও সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ পর্যন্ত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বা ২৭ শতাংশ বেশি। অর্থনীতির এই গতিধারা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স আহরণে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে হুন্ডি বা অবৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হলে এই আয়ের পরিমাণ আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিশেষে, প্রবাসীদের পাঠানো এই ‘হার্ড আর্নড মানি’ বা কঠোর পরিশ্রমের অর্থ বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এক বিশাল আশীর্বাদ। এই আয় কেবল রিজার্ভ সমৃদ্ধ করছে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ের দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।