চলমান কালবৈশাখি ঝড় ও টানা ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা জেলায় ভয়াবহ জনদুর্ভোগ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। গত দুই দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়ায় জেলার কৃষি উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, সড়ক যোগাযোগ এবং নগর জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় আরও ৩৬ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। বুধবার বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমলেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকে। মঙ্গলবার বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে, যা স্বাভাবিক জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট ১৭টি উপজেলায় এক হাজার ৭৩৩ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভুট্টা, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং তিল চাষ। বোরো ধান প্রায় পরিপক্ব অবস্থায় থাকায় বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেলেও কিছু এলাকায় পানি জমে থাকায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফসলের ক্ষতির সারসংক্ষেপ
| ফসলের ধরন | ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ |
|---|---|
| ভুট্টা | ৫৫০ হেক্টর |
| গ্রীষ্মকালীন সবজি | ৩৬৪ হেক্টর |
| তিল | ৯১ হেক্টর |
| অন্যান্য ফসল | ৭২৮ হেক্টর |
| মোট | ১৭৩৩ হেক্টর |
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধান কাটা শুরু হয়ে যাওয়ায় বড় ক্ষতি এড়ানো গেছে। তবে কৃষকদের সময়মতো ফসল সংগ্রহ না করার কারণে প্রতি বছরই এমন ঝুঁকি তৈরি হয় বলে তারা সতর্ক করেন।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ে শতাধিক বিদ্যুৎ খুঁটি ভেঙে গেছে, অর্ধশতাধিক রূপান্তর যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় দেড় হাজার স্থানে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে জেলার অনেক এলাকা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মেরামত কাজ ধীরগতিতে চলছে এবং জনবল সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের পরিবর্তনের কারণে আরও ঝড়ো আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী চব্বিশ ঘণ্টায় বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে কুমিল্লা নগরীর প্রধান সড়ক, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং খাল ও নালায় বর্জ্য জমে থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
বিশেষ করে পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে। কিছু কেন্দ্রে বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতির আলোতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে, আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় পানির মধ্যেই পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিষ্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
