ঢাকার রাস্তায় তেলের অভাবের প্রভাব প্রতিদিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত গাড়ি চালক, রাইড শেয়ারার এবং গণপরিবহন চালক—সকলের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাটানো, কর্মঘণ্টার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং আর্থিক ক্ষতি—সব মিলিয়ে নতুন বাস্তবতায় তাদের জীবন চলেছে।
সাত্তার হোসেন, যিনি বরিশালের গৌরনদীর সরিকল থেকে ঢাকায় গণপূর্তের একটি ঠিকাদারের মাইক্রোবাস চালান, বলেন, “শনিবার সকাল ১১টার দিকে মেঘনা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়াই। বিকেল সাড়ে ৪টার পর গাড়ি স্টেশন সামনে পৌঁছায়। পাম্পে পৌঁছাতে আরও কমপক্ষে এক ঘণ্টা লাগবে।” তিনি যোগ করেন, “এভাবে তেল নিতে গেলে দিনের কাজও ব্যাহত হয়, শরীরও ক্লান্ত।”
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি ও জিপচালকদের তেল নিতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। রাইড শেয়ারারদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। বাড়তি সময় খরচে ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ কমে গেছে, যার ফলে শারীরিক ক্লান্তি ও অসুস্থতার ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।
মেঘনা ফিলিং স্টেশনের লাইনে থাকা এক চিকিৎসক চালক মোহাম্মদ সোহেল অভিযোগ করেন, “নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের গোপালদী বাজারের পাশে একটি দোকানে অকটেন লিটার প্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। মনে হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাম্পের সঙ্গে আঁতাত করে তেল বিক্রি করছে।” জিপচালক মো. নুরুদ্দিন বলেন, “তেল সংকটের কারণে মালিক আমার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছেন। পাম্পে তেল সীমিত, আর বাড়িতে ফিরে সঠিক সময়ে বিশ্রাম পাওয়া যায় না।”
প্রাইভেটকার চালক জাকির হোসেন বলেন, “লাইনে দাঁড়ানো মানে গাড়ি বারবার স্টার্ট ও বন্ধ করতে হয়। এতে তেলও বেশি খরচ হয়।” রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাইড শেয়ারাররা প্রতিদিন বা দুই-তিন দিন অন্তর লাইনে দাঁড়ান। তারা জানান, দুই ঘণ্টার বেশি সময় নষ্ট হচ্ছে, ফলে আয়ও কমছে।
ফিলিং স্টেশন অনুযায়ী অপেক্ষার সময়
| ফিলিং স্টেশন | গড় অপেক্ষার সময় | যানবাহনের ধরন | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| মেঘনা | ৫–৭ ঘণ্টা | প্রাইভেটকার, জিপ, বাইক | ব্যস্ততম স্টেশন |
| সিটি, তেজগাঁও | ১.৫–২ ঘণ্টা | প্রাইভেটকার, বাইক | অপেক্ষার সময় কম |
| মধুবাগ, সিটি | ৪৫ মিনিট–২ ঘণ্টা | বাইক, প্রাইভেটকার | দূর থেকে আগমন বেশি |
| আশুলিয়া, সিটি | ২ ঘণ্টা | প্রাইভেটকার, জিপ | তেল সীমিত, লাইনে অপেক্ষা |
পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গাড়ি চলাচল কমেছে, বাস-ট্রিপ সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। গুলিস্তান থেকে গাজীপুর চন্দ্রা রুটের বাস চালক জানান, আগে দিনে চারবার ট্রিপ দিতেন, এখন অর্ধেক। জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তেলের সংকটের কারণে নগরবাসীর জীবনযাত্রা বদলে গেছে। দৈনন্দিন কাজ, বিশ্রাম এবং আয়—সবই প্রভাবিত। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ানো, শারীরিক ক্লান্তি এবং আর্থিক ক্ষতির কারণে তাদের জীবনধারা নতুন বাস্তবতায় প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবহন ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
এভাবে রাজধানীতে তেলের সংকট মানুষকে নতুন রুটিনে মানিয়ে নিতে বাধ্য করছে, যা তাদের জীবনযাত্রার অভ্যাস ও সময় ব্যবস্থাপনাকে ক্রমেই পরিবর্তিত করছে।
