জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের ভয়াবহ আঘাত: সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কেবল বারুদের গন্ধেই ভারী নয়, বরং এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ‘জ্বালানি শিল্প’ এখন সরাসরি যুদ্ধের কবলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। সোমবার (২ মার্চ) ইরানের একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেল ও গ্যাস উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় ধরণের ধসের সংকেত দিচ্ছে।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ভয়াবহতা

ইরান তার রণকৌশল পরিবর্তন করে এখন সরাসরি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি খাতের ওপর আঘাত হানছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশগুলো—যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—সেগুলো এখন ইরানের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এসব দেশ ইরানের ড্রোনের সামনে অনেকটাই অসহায়।

নিচে সোমবারের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ হওয়া প্রধান জ্বালানি স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:

স্থাপনার নামদেশবর্তমান অবস্থাপ্রভাবের গভীরতা
রাস তানুরা রিফাইনারিসৌদি আরবসম্পূর্ণ বন্ধদৈনিক ৫.৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন হ্রাস।
কাতারএনার্জি এলএনজিকাতারসাময়িকভাবে বন্ধবিশ্ব এলএনজি সরবরাহের ২০% কাতার নিয়ন্ত্রণ করে।
আহমাদি তেল শোধনাগারকুয়েতআংশিক ক্ষতিগ্রস্তড্রোন হামলায় ২ জন কর্মী আহত।
তামার ও লেভিয়াথানইসরায়েলউৎপাদন স্থগিতভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত।
কুর্দিস্তান তেলক্ষেত্রইরাককার্যক্রম বন্ধস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন।

তেলের বাজারে অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে একদিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিস্টাড এনার্জি’-র মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ থাকলে বিশ্ব চাহিদার ১০ শতাংশ বা প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে।

কেন জ্বালানি খাতকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান?

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক সাচা ব্রুচমান এবং টরবজর্ন সলটভেডটের মতে, ইরানের এই কৌশলের পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:

  1. আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি: জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করে বিশ্বব্যাপী হাহাকার সৃষ্টি করা, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ে।

  2. উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করা: যেসব দেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের মাটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরাং কেশাভারজিয়ান সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধ যদি ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী চার সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে কেবল জ্বালানি নয়, বরং দুবাই, দোহা বা কুয়েতের মতো দেশগুলোতে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেবে, কারণ তারা আমদানির জন্য সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে একধরণের হতাশা কাজ করছে। সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তার উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য সরিয়ে নেওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের হামলার মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।