জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন ও বাংলাদেশের আগামীর রাজনৈতিক গতিপথ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃত বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং একতরফা নির্বাচনের সংস্কৃতির কারণে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি (যাদের জন্ম ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর শুরুর দিকে) কখনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের স্বাদ পায়নি। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বর্তমানের এই নির্বাচনী আবহকে ‘বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করেছে, যা দেশের যুবশক্তির রাজনৈতিক গুরুত্বকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে তুলে ধরেছে।

জেন-জি ভোটারদের শক্তি ও প্রভাব

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তরুণ প্রজন্ম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেনারেশন জেডের এই বিশাল অংশটিই এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে ‘কিং মেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগে যেখানে পারিবারিক ঐতিহ্য বা বংশপরম্পরায় রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের রেওয়াজ ছিল, এখন তরুণরা সেই শিকল ভেঙে নিজেদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং বিবেকের প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। প্রার্থীরাও তাই প্রথাগত সভার চেয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তরুণদের মন জয়ে বেশি তৎপর।


নির্বাচনে জেন-জি ভোটারদের ভূমিকা ও প্রভাবকসমূহ

প্রভাবক বিষয়বিস্তারিত প্রভাব ও পর্যবেক্ষণ
মোট ভোটার হারদেশের মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশই জেনারেশন জেড।
তথ্যের প্রধান উৎসফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম।
ভোটের ধরনপারিবারিক উত্তরাধিকার বর্জন করে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ভোটদান।
রাজনৈতিক মেরুকরণবিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা; এনসিপি-র অবস্থান পরিবর্তন।
আন্তর্জাতিক প্রভাবদক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত আধিপত্যের ওপর ফলাফলের প্রভাব।

সোশ্যাল মিডিয়া ও তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল বিপ্লব

এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণের প্রধান রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী ওয়াসেক হোসেনের মতে, জেন-জি ভোটাররা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ভিডিও এবং ইনফোগ্রাফিকস দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ১৭ বছর বয়স থেকে ভোটার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই প্রজন্মের জন্য এটিই প্রথম ভোট। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারণামূলক কন্টেন্ট এবং অনলাইন জরিপগুলো তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে একটি বড় অংশ ভোটার এখনও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেননি, যা নির্বাচনী ফলাফলকে যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

তরুণদের এই সচেতনতা নিয়ে বারডেম মেডিকেল থেকে সদ্য এমবিবিএস পাস করা ডা. জিয়াউল হাসান বলেন, “আগে আমরা বাবা-মায়ের পছন্দের দলকেই সমর্থন করতাম। কিন্তু এখন আমার অনেক বন্ধুই পারিবারিক সমর্থন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেদের বিচার-বুদ্ধি ব্যবহার করছে। স্বাধীনভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারাটাই গত আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।”

রাজনৈতিক সমীকরণ ও নতুন দলের চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের ভোটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পর জেন-জিদের দ্বারা পরিচালিত নতুন রাজনৈতিক দল ‘এনসিপি’ এককভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে ব্যর্থ হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী নিশাত তাসনীম জানান, এনসিপির এই কৌশলগত পরিবর্তন ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিয়েছে। তবুও তরুণরা মনে করে, তাঁদের সমন্বিত ভোটই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কার হাতে থাকবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত অবস্থানের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে। জেন-জিদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, দেশের রাজনীতিতে নতুন এক রক্তসঞ্চার হয়েছে। এই তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।