চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে এক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জুলাই ও আগস্ট মাসে যেসব থানা এলাকায় আন্দোলনকারীরা পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন, সেসব থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আজ রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পর নাম ধরে ধরে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হবে। সভাপতি রিফাত রশিদ স্পষ্ট করে বলেন, যারা মাঠ পর্যায়ে কমান্ডিং অফিসার হিসেবে হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এটি কোনো সাধারণ তালিকা নয়, বরং শহীদদের রক্তের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের একটি প্রাথমিক আইনি ধাপ।
উল্লেখ্য যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতিপূর্বেই ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন এবং তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এবার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ছাত্ররা এই নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে যে তিন দফা দাবি ও লক্ষ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তা নিচের সারণিতে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি ও বিচারিক পদক্ষেপ
| দাবির বিষয় | প্রস্তাবিত পদক্ষেপ ও লক্ষ্য | সময়সীমা/অবস্থা |
| ওসি-এসপিদের বিচার | জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের তালিকা করে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের। | চলমান প্রক্রিয়া |
| বিপ্লবীদের দায়মুক্তি | ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সকল কর্মকাণ্ডে আইনি সুরক্ষা প্রদান। | ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাদেশ |
| স্থায়ী কমিশন গঠন | অভ্যুত্থানে জড়িত সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সুরক্ষা ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা। | স্থায়ী কমিশন প্রস্তাব |
| নেতাকর্মীদের মুক্তি | হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসানের নিঃশর্ত মুক্তি ও অভিযুক্ত ওসির অপসারণ। | আশু দাবি |
সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ আরও জানান, ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারির জন্য তাঁরা আইন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে মতবিনিময় করে অবিলম্বে তা নিশ্চিত করতে চাপ দেবেন। তিনি কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “শহীদদের রক্তের সাথে কোনো আপস হবে না। কোনো টালবাহানা নয়, এবার সরাসরি অ্যাকশন হবে।” এছাড়া ২০০৯ সাল থেকে সশস্ত্র বাহিনীতে যারা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পদায়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা জানান, মাহদী হাসানকে কেবল একটি মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু লড়াই শেষ হয়নি। তাঁকে সম্পূর্ণ নিঃশর্ত মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত এবং দোষী কর্মকর্তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের সংগ্রাম ও আইনি লড়াই যুগপৎভাবে চালিয়ে যাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
