আসামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ জুবিন গার্গ। তাঁর মৃত্যু ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে ঘটলেও জনগণের স্মৃতিতে তিনি যেন আগের মতোই জীবন্ত। মৃত্যুর মাসখানেক পর আসামের এক নির্বাচন কর্মকর্তার আচরণ আবারও প্রকাশ করল, জনপ্রিয়তার দিক থেকে জুবিন গার্গ কেবল একজন শিল্পী নন, বরং এক সামাজিক অনুভূতি।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভোটার তালিকা আপডেট করার নিয়ম অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিদের নাম ‘মৃত’ চিহ্নিত করা বাধ্যতামূলক। এই নীতির মধ্যেই দায়িত্ব পালন করছিলেন তাফিজ উদ্দিন, যিনি বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে জুবিন গার্গের পরিবার কখনো যে এলাকায় থাকতেন, সেই অঞ্চলেই তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্ব পান।
তালিকার একটি পৃষ্ঠায় জুবিনের পুরোনো ছবি ও নাম দেখে তিনি মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যান। তাফিজ উদ্দিন বলেন, “কাগজে তাঁর নাম দেখলেই সেই অগণিত স্মৃতি মাথায় ভিড় করছিল—উৎসবের রাত, মেলার মঞ্চ, রোডশো, তাঁর অসংখ্য গান। মনে হচ্ছিল, তাঁকে ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করা মানে যেন নিজের এক অংশকে মৃত বলে মানা।”
গবেষকদের মতে, এই প্রতিক্রিয়া কোনো ব্যতিক্রম নয়। সমাজে যখন কোনো শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে এক প্রজন্মের অনুভূতির প্রতীক হয়ে ওঠেন, তখন প্রশাসনিক নথির বাস্তবতা ও জনগণের স্মৃতির বাস্তবতা মাঝে বড় ফারাক তৈরি হয়। তাফিজ উদ্দিনের প্রতিক্রিয়া সেই সামাজিক-মানসিক টানাপোড়েনেরই প্রতিফলন।
তাফিজ তাই নিয়মভাঙা সিদ্ধান্ত নেন। ‘মৃত’ শব্দের বদলে লেখেন— “চিরকাল অমর হয়ে থাকুন, আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।” এই একটি বাক্য যেন প্রশাসনিক কাঠামোর শুষ্কতার মধ্যে মানবিকতার একটি জানালা খুলে দেয়।
পরবর্তীতে এই লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসতেই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জুবিন গার্গের পরিবারের সদস্য পালমি বরঠাকুর পোস্টটি শেয়ার করে লেখেন, “এই ভালোবাসাই আমাদের সাহস জোগায়। আমরা কৃতজ্ঞ।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, এই ঘটনাটি সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রতি জনতার মানসিক সংযোগের উদাহরণ। যেখানে একজন শিল্পীর মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিচ্ছবি সমাজের আচরণ ও প্রশাসনিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।
আসামে জুবিন গার্গকে প্রজন্মগত এক সেতুবন্ধ হিসেবে দেখা হয়। তাই তাঁর মৃত্যু নিয়ে জনগণের আবেগ প্রশমিত হতে সময় লাগবে বলেই বিশ্লেষকদের মত। তাফিজ উদ্দিনের ঘটনার মাধ্যমে আবার প্রমাণ হলো—সাংস্কৃতিক আইকনরা প্রশাসনিক নথিতে মৃয়মাণ হলেও মানুষের স্মৃতিতে তাঁরা অমর।
