জীবন বীমা করপোরেশন বনাম সরকারি জমি বিরোধ

ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলের ৮০ নম্বর প্লটে অবস্থিত জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) এর প্রাক্তন প্রধান কার্যালয় ও ১১ তলা বিশিষ্ট ভবনের মালিকানা ৩৬ বছর পার হলেও এখনও নিশ্চিত হয়নি। জেবিসি দাবি করছে, তারা বৈধ উত্তরসূরি এবং দীর্ঘ তিন দশক ধরে সম্পত্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিস জমিটিকে সরকারি বলে দাবি করছে।

বিরোধের সূচনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া

জেবিসি ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জমিটি নিজেদের নামে নিবন্ধনের জন্য ঢাকা ডিসি অফিসে আবেদন করে। প্রায় এক বছর পর, ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর ডিসি অফিস আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে। ডিসি অফিস জানিয়েছে, রিভিশনাল সার্ভে ও সিটি জরিপ খতিয়ান নম্বর ১ এবং দাগ নম্বর ১৫৭৩ ও ১৪২৫ অনুযায়ী জমিটি সরকারি নামে নিবন্ধিত। জেবিসির জমা দেওয়া দলিল মালিকানা প্রমাণ করতে যথেষ্ট নয়। চিঠিতে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্সের ভূমিকা

প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্স বাংলাদেশে ১৯৬৯ সালে সদর দপ্তর স্থাপন করে এবং ৬ কাঠার ৮০ নম্বর প্লটটি ক্রয় করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে জীবন বীমা করপোরেশন। ১৯৮৯ সালে প্রুডেনশিয়াল সম্পূর্ণ ব্যবসা জেবিসির কাছে হস্তান্তর করে। এই হস্তান্তর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে ৫ জুন ১৯৮৯ সালে কার্যকর হয়।

সম্পদ ও দায়ের বিবরণ

প্রুডেনশিয়াল কোম্পানির ১৯৮৭ সালের নিট দায় ছিল প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। ১৯৮৮ সালে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট আয় ছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে প্রিমিয়াম আয় ছিল ৯০ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য সম্পদ ছিল সরকারি ঋণপত্র, ডিবেঞ্চার এবং শিল্প খাতে শেয়ার।

সম্পদের ধরনপরিমাণমন্তব্য
ডিবেঞ্চার১ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকাহাউস বিল্ডিং করপোরেশনে ৫.৫% সুদে
সরকারি ঋণপত্র৩৫ লাখ টাকা১৯৭৩, ১৯৭৮, ১৯৭৯ সালের মিলিত
শেয়ার২০,৮৩৩টিপ্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলস, প্রতি শেয়ার ১০ টাকা
ভবন ও জমিপ্রায় ৮০ কোটি টাকা১১ তলা, ৪,০০০ স্কয়ার ফিট প্রতি তলা

জেবিসির দাবিসমূহ

জেবিসি জানিয়েছে, তারা দীর্ঘ তিন দশক ধরে সম্পত্তি ব্যবহার করছে এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জমি উন্নয়ন করের রসিদ তাদের কাছে রয়েছে। এই নথি জেবিসি তাদের বৈধ মালিকানা প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছে।

আইনি জটিলতা

বিরোধের মূল বাধা হলো লন্ডনে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এখনও সত্যায়িত হয়নি। ডিসি অফিস মনে করছে, দীর্ঘদিন দখল বা খাজনা প্রদানই যথেষ্ট নয়। ১৬ অক্টোবর ২০২৩ চিঠিতে তারা জানায়, সরকারি জরিপ রেকর্ড অনুযায়ী জমিটি সরকারের নামে রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে কার্যত ‘সরকার বনাম সরকার’ দ্বন্দ্ব বলে মনে করছেন। প্রশাসনিক সমাধান না হলে বিষয়টি আদালতে যাবে। এটি সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি রেকর্ড নির্ভুলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আব্দুর রাফিউল আলম জানিয়েছেন, ১ নম্বর খতিয়ান অনুযায়ী জমিটি সরকারি খাস। ডিসি অফিসের বাইরে অন্য কোনো কর্তৃত্ব নেই। জেবিসিকে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে হবে।

সর্বশেষ, দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে চলমান এই জমি বিতর্ক রাজধানীর বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে।