জিডিপি অনুপাতে কর বৃদ্ধি ও বাজার স্থিতিশীলতার ঘোষণা

সিলেট সার্কিট হাউজে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর কাঠামো এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, সরকারের লক্ষ্য ব্যক্তি পর্যায়ে করের বোঝা বাড়ানো নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় আয়ের তুলনায় কর সংগ্রহের হার বৃদ্ধি করা।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর কাঠামো

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পরিকল্পনা উদ্ধৃত করে বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি কর আরোপ না করে জিডিপির (GDP) অনুপাতে কর সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনও অনেক নিচে, যা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জিং। এছাড়া বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা নিয়ে তিনি বলেন, আমেরিকার ট্যারিফ নীতির কারণে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলেও দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে এর প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা যাতে সময়মতো বেতন ও বোনাস নিয়ে সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সরকার তা নিশ্চিত করবে।

নিচে সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

মন্ত্রীর নাম ও মন্ত্রণালয়প্রধান আলোচনার বিষয়গৃহীত পদক্ষেপ বা লক্ষ্য
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (বাণিজ্য)কর কাঠামো ও এফটিএইইউ-এর সাথে FTA চুক্তির প্রস্তাব এবং জিডিপি অনুপাতে কর বৃদ্ধি।
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (পানিসম্পদ)হাওর রক্ষা ও নদী শাসনসিলেট অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ভাঙন রোধ ও দুর্নীতিমুক্ত বাঁধ নির্মাণ।
আরিফুল হক চৌধুরী (প্রবাসী কল্যাণ)বৈদেশিক শ্রমবাজারসৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধ বাজারগুলো পুনরায় চালুকরণ।
বাজার ব্যবস্থাপনানিত্যপণ্য সরবরাহরমজান ও পরবর্তী মাসগুলোতে বাজারদর স্থিতিশীল রাখা।

পানিসম্পদ ও আঞ্চলিক উন্নয়ন

সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সিলেটের ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় নদী ভাঙন এবং হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে পানিসম্পদ খাতে যে ব্যাপক দুর্নীতির নজির দেখা গেছে, তা থেকে বর্তমান প্রশাসনকে মুক্ত রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, প্রতিটি প্রকল্পের টাকা যাতে সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়, তা তদারকি করা হবে। বিশেষ করে বর্ষার আগেই হাওর অঞ্চলের বাঁধ সংস্কারের কাজ দুর্নীতিমুক্তভাবে শেষ করার আশ্বাস দেন তিনি।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও শ্রমবাজার

বাণিজ্যমন্ত্রী সভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ‘এফটিএ’ সম্পাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য সুখবর আসছে। সৌদি আরব এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যে জটিলতা ছিল, তা নিরসনে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং খুব শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।

সিলেটের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। সরকার ও প্রশাসনের এই সমন্বিত উদ্যোগ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।