জাতির বীর সেনানায়ক জেনারেল ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী—মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক, যিনি ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত—তার ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। সিলেট নগরীর হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারসংলগ্ন গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। জাতির এই কৃতী সন্তানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেট, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

রাজধানীর রাওয়ার হেলমেট হলে বেলা ১১টায় এক আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সিলেটে তার জন্মস্থান বালাগঞ্জ উপজেলার দয়ামীর গ্রামেও স্থানীয় প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও সামাজিক সংগঠনসমূহ পৃথক কর্মসূচি পালন করছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার দয়ামীর গ্রামে ওসমানীর জন্ম। তার পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ও মাতা জোবেদা খাতুন। শৈশবে পারিবারিক পরিবেশেই তার শিক্ষার সূচনা। ১৯২৯ সালে গৌহাটির কটনস স্কুলে ভর্তি হন। পরে ১৯৩২ সালে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৩৪ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন এবং ইংরেজিতে কৃতিত্বের জন্য ‘প্রিটোরিয়া অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৩৬ সালে আইএ এবং ১৯৩৮ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থায় নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোরের (ইউওটিসি) সার্জেন্ট নিযুক্ত হন।

সামরিক জীবন ও নেতৃত্ব

১৯৩৯ সালে এমএ (ভূগোল) অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪০ সালের ৫ অক্টোবর দেরাদুন সামরিক একাডেমি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কিং কমিশন লাভ করেন। ১৯৪২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মেজর পদে উন্নীত হয়ে একটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হন—যা ছিল নজিরবিহীন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ১৯৪৩-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মা রণাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে যোগ দেন এবং কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ

১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণের পর ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সমগ্র যুদ্ধ পরিচালনায় ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব দেন। তার কৌশলগত পরিকল্পনা ও সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধসংগঠন স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর তিনি নবগঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।

জীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক

বছরঘটনামন্তব্য
১৯১৮জন্মসিলেট, দয়ামীর গ্রাম
১৯৪০কিং কমিশন লাভদেরাদুন সামরিক একাডেমি
১৯৪২সর্বকনিষ্ঠ মেজর২৩ বছর বয়সে
১৯৭১মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কমুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব
১৯৮৪ইন্তেকালসিলেটে সমাহিত

জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য অবদানের জন্য জেনারেল ওসমানী ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। তার আদর্শ, নেতৃত্বগুণ ও দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মকে দেশগঠনে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।