জরুরি অবস্থা জারির জন্য আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উত্তাল ও নাটকীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তী দেড় বছরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। বঙ্গভবনে দেওয়া এই একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর তথাকথিত ‘প্রাসাদবন্দি’ জীবনের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্যের অজানা গল্প, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


৫ আগস্টের সেই নাটকীয় ৪০ মিনিট

রাষ্ট্রপতি জানান, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন দুপুর ১২টা পর্যন্তও বঙ্গভবনের পরিবেশ ছিল অনিশ্চিত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং তাঁর জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হয় তিনি আসছেন না এবং এর কিছুক্ষণ পরেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি দেশত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, সেই সময়টি ছিল চরম উত্তজনা ও অনিশ্চয়তার।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বিকেল ৩টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তী ৩ ঘণ্টা বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির রুদ্ধশ্বাস বৈঠক চলে। রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করেন যে, সেই সময় সামরিক আইন (মার্শাল ল) বা জরুরি অবস্থা জারির প্রবল চাপ থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী এবং তিনি নিজে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় অনড় ছিলেন। বিশেষ করে সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার কোনো মোহ ছিল না বলে রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।


৫ আগস্টের ঘটনাক্রম ও সিদ্ধান্তসমূহ

সময়/পর্যায়ঘটনা ও সিদ্ধান্ত
দুপুর ১২:০০ – ১২:৪০প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গভবনে আসার পরিকল্পনা বাতিল এবং দেশত্যাগ।
বিকেল ৩:০০সেনাপ্রধানের সাথে রাষ্ট্রপতির প্রথম ফোনালাপ ও পরিস্থিতি অবহিতকরণ।
বিকেল ৪:০০ – ৭:০০তিন বাহিনী প্রধানের সাথে বৈঠক; অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত।
রাত ৮:০০ – ১০:০০রাজনৈতিক দল ও ছাত্রনেতাদের সাথে সমন্বয় বৈঠক।
রাত ১১:০০জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা ঘোষণা।
৮ আগস্টসুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনি মতামত গ্রহণ ও সরকার শপথ।

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ ও ড. ইউনূসের নিয়োগ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সংবিধানে সরাসরি কোনো বিধান না থাকায় একপ্রকার সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি নিজেই তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের আইনি মতামত গ্রহণ করেন। এই আইনি মতামতই ছিল তাঁর জন্য ‘রক্ষাকবচ’। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ছাত্রনেতারা প্রস্তাব করেন এবং শত বাধা সত্ত্বেও তারা এই সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। ড. ইউনূস ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন থাকায় যোগাযোগে কিছুটা বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বেই সরকার গঠিত হয়।

দীর্ঘ দেড় বছরের মানসিক যাতনা ও গৃহবন্দিত্ব

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ ছিল রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কষ্টের বর্ণনা। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তাঁকে এক প্রকার গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। দুই ঈদে তাঁকে জাতীয় ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতে দেওয়া হয়নি, এমনকি হার্টের ফলোআপ চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর বা লন্ডনে যাওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করাই ছিল এই আচরণের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, “আমি যেন এই প্রাসাদে গৃহবন্দি ছিলাম।”

বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর রাষ্ট্রপতি নিজেকে ভারমুক্ত ও স্বস্তিবোধ করছেন। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, দেশে এখন স্থিতিশীলতা ফিরছে। নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষে তিনি পুনরায় আইন পেশায় ফিরে যেতে চান এবং একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে চান।

পরিশেষে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার ও জটিল সময়ের দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। ক্ষমতা, রাজনীতি এবং ব্যক্তিজীবনের টানাপড়েনের এই আখ্যান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।