,

জন্মদিনে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় স্মরণ ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী

বৃষ্টি কখনো প্রকৃতির নিজস্ব ভাষা, কখনো স্মৃতির দরজায় নীরব কড়া নাড়া। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় মিশে থাকতে পারে হারিয়ে যাওয়া সময়, প্রিয় মানুষের মুখ কিংবা কোনো একান্ত অনুভূতির অনুরণন। আর সেই বৃষ্টির সঙ্গে যখন মিশে যায় হৃদয়ছোঁয়া কোনো গান, তখন স্মৃতিরা যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়’—গানের এই কথাগুলো তাই শুধু একটি গানের পঙ্‌ক্তি নয়, অনেক শ্রোতার কাছে ভালোবাসা, বিরহ ও স্মৃতির এক আবেগময় প্রকাশ। এই গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কণ্ঠশিল্পী ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হচ্ছে তাঁকে।

শুভ জন্মদিন, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁর পরিচয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধনা, রাগসংগীতের সৌন্দর্য এবং বাংলা গানের আবেগময় পরিবেশনা। জনপ্রিয়তার প্রচলিত মাপকাঠির বাইরে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ একজন মানুষকে কীভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রেরণা জোগাতে পারে।

সুরের সাধনায় গড়ে ওঠা এক স্বতন্ত্র পরিচয়

সংগীতের বিভিন্ন ধারার মধ্যে উচ্চাঙ্গ সংগীত এমন একটি শিল্পমাধ্যম, যেখানে কণ্ঠের মাধুর্যের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অনুশীলন, রাগের ব্যাকরণ সম্পর্কে জ্ঞান, তাল-লয়ের সূক্ষ্ম বোধ এবং স্বরের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। এখানে শিল্পীর দক্ষতা কেবল সুরেলা কণ্ঠে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাগের মেজাজ বোঝা, সুরের বিস্তার ঘটানো এবং আবেগকে সংগীতের ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চা ও শ্রোতৃপরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এই ধারাকে সমৃদ্ধ করতে কাজ করেছেন বহু নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী উল্লেখযোগ্য। তাঁর সংগীতচর্চায় ধ্রুপদি সংগীতের গভীরতা, রাগসংগীতের সূক্ষ্মতা এবং বাংলা গানের আবেগ এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।

তিনি সংগীতকে কেবল পরিচিতি কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। সুরের শুদ্ধতা, রাগের সৌন্দর্য এবং সংগীতের নিজস্ব মর্যাদা রক্ষার মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের সাধনা ও সংগীতের প্রতি একাগ্রতা তাঁকে শ্রোতাদের কাছে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

পাতিয়ালা ঘরানার ঐতিহ্যে সংগীতশিক্ষা

ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর একটি পাতিয়ালা ঘরানা। এই ঘরানার দুই প্রখ্যাত শিল্পী ওস্তাদ আমানত আলী খান ও ওস্তাদ ফতেহ আলী খানের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম গ্রহণ করেন নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁর সংগীতজীবনকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গুরুপরম্পরায় অর্জিত জ্ঞান, নিয়মিত রেওয়াজ এবং সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগের মধ্য দিয়ে তিনি বিভিন্ন সংগীতধারায় নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন। খেয়ালের বিস্তার, ঠুমরির আবেগ, গজলের মাধুর্য কিংবা রাগসংগীতের সূক্ষ্ম অলংকার—এসবের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও চর্চা তাঁকে বহুমাত্রিক সংগীতব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করেছে।

উচ্চাঙ্গ সংগীতের সৌন্দর্য অনেক সময় সূক্ষ্ম স্বরপ্রয়োগ, রাগের মেজাজ এবং পরিবেশনার গভীরতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এই সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে যেমন মনোযোগী শ্রোতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিল্পীর দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নিষ্ঠা। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর সংগীতজীবন সেই সাধনানির্ভর ধারার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের পরিচয় বহন করে।

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯৫২ সালের ২৫ অক্টোবর নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার খৈনকুট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। পরিবারের সঙ্গে শৈশবের কিছু সময় গ্রামে কাটলেও তাঁর বেড়ে ওঠার প্রধান পরিসর ছিল ঢাকা। গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে শহুরে জীবনে বেড়ে ওঠা তাঁর জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ক্রমেই গভীর হয়ে ওঠে। একসময় সংগীতচর্চা তাঁর জীবনের প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়। জীবনের একটি পর্যায়ে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেন তিনি। তবে পেশাগত জীবনের এই অভিজ্ঞতার মধ্যেও সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল।

টেলিভিশনে আত্মপ্রকাশ ও আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রা

নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রার সূচনা হয় ১৯৭৯ সালে। সে বছর তিনি প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে সংগীত পরিবেশন করতে যান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিদেশি শ্রোতাদের কাছে বাংলা গান ও বাংলাদেশের সংগীতঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ পান।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর প্রথম সংগীত পরিবেশনা ছিল ১৯৮৫ সালে ‘আমার যত গান’ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি ও গীতিকার ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

একজন শিল্পীর সংগীত যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তাঁর পরিবেশনা ব্যক্তিগত পরিচিতির পাশাপাশি নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর বিদেশের মঞ্চে সংগীত পরিবেশনের অভিজ্ঞতা সেই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

জনপ্রিয়তার ভিড়ে শুদ্ধ সংগীতের পথচলা

আশি ও নব্বইয়ের দশক ছিল বাংলা গানের বিকাশের উল্লেখযোগ্য সময়। ক্যাসেটের মাধ্যমে গান পৌঁছে যেত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে। নতুন শিল্পী, নতুন সুর এবং ভিন্নধর্মী সংগীতায়োজন জনপ্রিয় সংগীতের জগৎকে সমৃদ্ধ করছিল। এই সময়ে অনেক শিল্পী দ্রুত তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

সেই পরিবর্তনশীল সংগীতপরিবেশে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর পরিচিতি গড়ে ওঠে শুদ্ধ সংগীতের চর্চা এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। তাঁর শিল্পীজীবনকে কেবল জনপ্রিয় গানের সংখ্যা কিংবা সাময়িক পরিচিতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে সংগীতে তাঁর অবস্থানের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

কারণ উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চা এমন একটি পথ, যেখানে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের অনুশীলন ও ধৈর্য। একটি রাগের যথাযথ পরিবেশনা, স্বরের নিয়ন্ত্রণ কিংবা গানের আবেগকে সঠিকভাবে প্রকাশ করার পেছনে থাকে বছরের পর বছর ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা। এই ধারার শিল্পীদের অবদান তাই জনপ্রিয়তার তাৎক্ষণিক হিসাবের চেয়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধার অন্যতম কারণ তাঁর সংগীতের গভীরতার সঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক। প্রচলিত জনপ্রিয়তার বাইরে থেকেও একজন শিল্পী কীভাবে নিজের সাধনা ও স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারেন, তাঁর জীবন সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়’

নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর বহুল পরিচিত গান ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়’ শ্রোতাদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। গানটির শিরোনামেই রয়েছে স্মৃতি, বিরহ ও ভালোবাসার আবেগ। বৃষ্টির সঙ্গে প্রিয় মানুষের স্মৃতির যে সম্পর্ক, তা বাংলা গানের পরিচিত বিষয় হলেও অনুভূতির গভীরতায় প্রতিটি মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা।

বৃষ্টির শব্দ কখনো মনকে বিষণ্ন করে, কখনো ফিরিয়ে আনে অতীতের কোনো মুহূর্ত। কোনো প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি যখন মনে তীব্রভাবে অনুভূত হয়, তখন প্রকৃতির সাধারণ দৃশ্যও ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এই গানের আবেদনও সেই চিরচেনা অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।

একটি গান মানুষের মনে কতটা স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে, তা বোঝা যায় সময়ের সঙ্গে তার আবেদন অটুট থাকার মধ্য দিয়ে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একই গান ভিন্ন অর্থে ধরা দিতে পারে। কখনো তা ভালোবাসার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, কখনো বিচ্ছেদের বেদনা মনে করিয়ে দেয়, আবার কখনো নিঃসঙ্গ মুহূর্তে সঙ্গীর মতো পাশে থাকে।

জন্মদিনে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে এই গান মনে পড়ার মধ্যে তাই রয়েছে বিশেষ আবেগ। গানটি কেবল একজন শিল্পীর পরিচিত পরিবেশনা নয়; অনেক শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতি ও স্মৃতির সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শিল্পীর কণ্ঠে গাওয়া কোনো গান যখন শ্রোতার নিজের জীবনের গল্পের অংশ হয়ে যায়, তখন সেই গানের আবেদন আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

প্রচারের আলো থেকে দূরে সংগীতের প্রতি নিবেদন

নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিভৃতচারী স্বভাবের একটি পরিচিতি যুক্ত রয়েছে। প্রচারের আলোয় নিয়মিত উপস্থিত থাকার পরিবর্তে সংগীতচর্চা এবং নিজের পরিসরে থাকা তাঁর জীবনযাপনের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে উঠে আসে।

বর্তমান সময়ে শিল্পীদের পরিচিতি অনেকাংশে নির্ভর করে গণমাধ্যমে উপস্থিতি, প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার ওপর। এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের সাধনানির্ভর শিল্পচর্চার মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ শিল্পের গভীরতা সব সময় প্রচারের ব্যাপ্তির সঙ্গে মেলে না।

একজন শিল্পীর প্রকৃত অর্জন কেবল কত মানুষ তাঁকে চেনেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পরিবেশনা শ্রোতার মনে কতটা স্থায়ী অনুরণন তৈরি করে, সংগীতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা কতটা গভীর এবং শিল্পের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তিনি কতটা ধারণ করতে পারেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে উচ্চাঙ্গ সংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অভিজ্ঞ শিল্পীদের পরিবেশনা, সংগীতভাবনা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়মিতভাবে তুলে ধরা গেলে এই ধারার প্রতি নতুন শ্রোতাদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

পরিবারেও সংগীতের নিবিড় উপস্থিতি

নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর পারিবারিক জীবনেও সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তাঁর স্ত্রী সাবরা নিয়াজ একটি সংগীতপরিবারের সন্তান। তাঁর শ্বশুর সৈয়দ জাকির হোসেনও উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত একজন খ্যাতিমান সুরস্রষ্টা ও গুরু ছিলেন।

এমন পারিবারিক পরিবেশ সংগীতের প্রতি অনুরাগ, রুচি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করার সুযোগ তৈরি করে। তাঁদের দুই সন্তান—ফাইয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী ও মেহনাজ চৌধুরী বারখা—পেশাদার সংগীতশিল্পী না হলেও গান করেন এবং সংগীতের প্রতি অনুরাগী।

একটি পরিবারে সংগীতের উপস্থিতি শুধু গান শেখা কিংবা পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শৃঙ্খলা, মনোযোগ, সৌন্দর্যবোধ এবং শিল্পের প্রতি সম্মান। সেই বিবেচনায় নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর পারিবারিক পরিমণ্ডলে সংগীতের এই সংযোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

বাংলাদেশের সংগীতঐতিহ্যে উচ্চাঙ্গ সংগীতের গুরুত্ব

একটি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে ওঠে নানা ধরনের শিল্পচর্চার সমন্বয়ে। জনপ্রিয় গান, চলচ্চিত্রের সংগীত কিংবা লোকগানের পাশাপাশি উচ্চাঙ্গ সংগীতও সেই পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য, গুরু-শিষ্য পরম্পরা, নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা।

উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চা সময়সাপেক্ষ। নিয়মিত রেওয়াজ, দক্ষ শিক্ষকের কাছে তালিম এবং সংগীতের ব্যাকরণ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন ছাড়া এই ধারায় দক্ষতা তৈরি করা কঠিন। তাই এর বিকাশে সংগীতশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাজ সংরক্ষণ করা জরুরি।

ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর মতো শিল্পীদের জীবন ও সংগীতসাধনা এই ধারার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়। সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অনুভূতিকে প্রকাশ করে, মননকে সমৃদ্ধ করে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দৃঢ় করে।

এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে শিল্পীদের পরিবেশনা সংরক্ষণ, সংগীতের ইতিহাস নথিবদ্ধ করা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো ধারায় এমন সংরক্ষণ ভবিষ্যতের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।

জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা

ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর জন্মদিন কেবল একজন শিল্পীকে শুভেচ্ছা জানানোর উপলক্ষ নয়; এটি তাঁর সংগীতজীবন, সাধনা এবং বাংলা গানে রেখে যাওয়া অবদান স্মরণ করারও সময়। তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত গান শ্রোতাদের মনে যে আবেগ ও স্মৃতির জায়গা তৈরি করেছে, সেটিই একজন শিল্পীর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পরিচয় বহন করে।

সময় বদলায়, সংগীতের ধরন বদলায়, শ্রোতাদের রুচিতেও আসে পরিবর্তন। কিন্তু কোনো গান যদি মানুষের জীবনের বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তবে তার আবেদন সহজে হারিয়ে যায় না। প্রিয় কণ্ঠে গাওয়া সেই গান কখনো পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, কখনো নতুন করে অনুভব করতে শেখায়।

আজকের এই বৃষ্টিভেজা দিনে তাই আবারও মনে পড়ে—‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়’। গানের কথার সঙ্গে মিশে থাকে বৃষ্টির বিষণ্নতা, ভালোবাসার স্মৃতি এবং সুরের এক অদ্ভুত মায়া। সেই মায়ার মধ্য দিয়েই মনে পড়ে যান ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী।

শুভ জন্মদিন, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী।

আপনার সংগীতসাধনা বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করুক। আপনার কণ্ঠের মাধুর্য ও শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগাক। আপনি সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন এবং দীর্ঘজীবী হোন—এই কামনা।

জন্মদিনে আপনার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।

সুর বেঁচে থাকুক, সাধনা বেঁচে থাকুক। শ্রোতাদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুক ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গান।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।