জঙ্গল সলিমপুরের ভয়ংকর অবস্থা ও পাহাড় উজাড়

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর দেশের অন্যতম বিতর্কিত পাহাড়ি এলাকা হিসেবে পরিচিত। নামের সঙ্গে ‘জঙ্গল’ থাকলেও বর্তমানে এ এলাকার অধিকাংশ পাহাড় প্রায় উজাড়। অবৈধ বসতি স্থাপন, পাহাড় কেটে প্লট–বাণিজ্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এলাকায় আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীত লিংক রোডের উত্তরে জঙ্গল সলিমপুর বিস্তৃত। মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও অবস্থানগত কারণে চট্টগ্রাম নগরের কেন্দ্রীয় অংশের কাছাকাছি। পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এলাকা অবস্থিত।

এ অঞ্চল মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত—ছিন্নমূল এলাকা এবং আলীনগর। উভয় এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার ও বিপণিবিতান। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কাঁচা ও পাকা ঘর। পাশাপাশি অব্যাহত রয়েছে পাহাড় কেটে প্লট তৈরির বাণিজ্য।

পাহাড় দখল ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রভাব

নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে খাসজমি দখল করে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্লট বিক্রি শুরু করেন। পরে বাহিনীর মধ্যেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, একসময় র‌্যাবের সঙ্গে সংঘর্ষে আক্কাস নিহত হন। এরপর সহযোগীরা আলাদা দল গড়ে তোলে। বর্তমান সময়ে প্রধানভাবে ইয়াসিন মিয়া, কাজী মশিউর রহমান, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকের নেতৃত্বে এ এলাকায় বসতি ও প্লট বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমানে দুইটি প্রধান সংগঠন অঞ্চলটির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে—আলীনগর বহুমুখী সমিতি এবং মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ। দুই সংগঠন মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।

নিরাপত্তা সংকট ও প্রশাসনের অভিযান

দীর্ঘদিন জঙ্গল সলিমপুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। পাহাড়ি দুর্গম পথ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এবং বাইরের মানুষের প্রবেশে বিধিনিষেধ অভিযানের কাজকে কঠিন করে। সম্প্রতি এক অভিযানে র‌্যাব কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, অন্যরা আহত হন। এরপর সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও বিশেষ পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়।

অভিযান কর্মকর্তারা জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, সম্পূর্ণ এলাকা পাহাড়শূন্য হয়ে যাবে।

সরেজমিন চিত্র

জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে পাহাড় কেটে তৈরি সড়ক, অসংখ্য বাড়িঘর, দোকানপাট ও বাজার। পাহাড়ের চূড়াতেও বসতি গড়ে উঠেছে। কোথাও ইটের দেয়াল তুলে প্লট তৈরি করা হয়েছে বিক্রির জন্য।

এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আশপাশে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়, বাজার ও দোকান রয়েছে। এখান থেকে আলীনগর, কাঁঠালতলা, লটকাটুলি ও লোহার ব্রিজ এলাকার দিকে বিভিন্ন রাস্তা চলে গেছে।

উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাধা

২০২২ সালে জেলা প্রশাসন এলাকাকে ১১ ভাগে বিভক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনায় নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ সরকারি স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল। কারাগার নির্মাণের জন্য ৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হলেও অধিকাংশ জমি দখলে থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

যৌথ অভিযান শেষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি এবং পূর্বনির্ধারিত উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

এলাকার মৌলিক তথ্য

বিষয়তথ্য
অবস্থানসীতাকুণ্ড উপজেলা, চট্টগ্রাম
মোট আয়তনপ্রায় ৩ হাজার ১০০ একর
প্রধান অংশছিন্নমূল এলাকা ও আলীনগর
বসতি স্থাপনের শুরুনব্বইয়ের দশক
প্রধান সমস্যাপাহাড় কাটা, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, সন্ত্রাসী প্রভাব
সম্ভাব্য উন্নয়ন পরিকল্পনাকেন্দ্রীয় কারাগার, মডেল মসজিদ, সরকারি স্থাপনা

স্থানীয়রা জানান, কম দামে জমি কিনে তারা বসতি স্থাপন করেছেন। তবে ভবিষ্যতে উচ্ছেদ হলে বিকল্প বসতির দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও পরিকল্পিত উন্নয়ন ছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।