জকিগঞ্জে ইউপি চেয়ারম্যানকে হেনস্তা ও সমন্বয়ক অবরুদ্ধের ঘটনা

সিলেটের জকিগঞ্জে মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুস শহীদকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ও ‘ডেভিল’ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক থানায় সোপর্দ করার ঘটনা ঘটেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক দাবিদার ও স্থানীয় ছাত্রদল নেতা জাফর আহমেদের নেতৃত্বে এই ঘটনাটি ঘটে। তবে এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে মানিকপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। তারা জাফর আহমেদকে উপজেলা পরিষদ ভবনের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখে। বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রাজ্জাক পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও উত্তেজনার শুরু

বুধবার বিকেলে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে জনপ্রতিনিধিদের একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বের হওয়ার সময় জাফর আহমেদ ও তার অনুসারীরা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুস শহীদকে ঘিরে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জাফর আহমেদ চেয়ারম্যানকে ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ ও ‘শয়তান’ বলে সম্বোধন করছেন এবং তার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ থাকার দাবি তুলছেন। এরপর তারা তাকে ধরে থানায় নিয়ে যান।

এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সন্ধ্যায় মানিকপুর ইউনিয়নের শত শত বাসিন্দা উপজেলা পরিষদে জড়ো হন। তারা জাফর আহমেদকে ‘ভুয়া সমন্বয়ক’ এবং ‘সুবিধাবাদী’ আখ্যা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। জনরোষ থেকে জাফরকে উদ্ধার করতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয় এবং গভীর রাতে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা

আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাফর আহমেদ গত ৭ সেপ্টেম্বর জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে মামলাটি দায়ের করেছিলেন, সেখানে ১০৭ জন আসামির তালিকায় আবদুস শহীদের নাম নেই। ওসি আবদুর রাজ্জাক স্পষ্ট করেছেন যে, শহীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো ওয়ারেন্ট বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই।

ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের তথ্যাবলি নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:

পক্ষ/ব্যক্তিপরিচয়অবস্থান/মন্তব্য
আবদুস শহীদভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, মানিকপুর ইউপিকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নন।
জাফর আহমেদসমন্বয়ক (দাবিকৃত) ও ছাত্রদল নেতাচেয়ারম্যানকে আওয়ামী লীগ নেতা বলে দাবি করেন।
জকিগঞ্জ থানা পুলিশআইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীশহীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলার রেকর্ড নেই।
আবিদুর রহমানসভাপতি, উপজেলা যুব জামায়াতশহীদের পক্ষে অবস্থান ও জাফরের কাজের নিন্দা।
সিলেট জেলা ছাত্রদলরাজনৈতিক সংগঠনজাফরের দলীয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয় নেতৃত্ব ও পুলিশের ভাষ্য

সিলেট জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুবের আহমেদ জানিয়েছেন, জাফর ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের কর্মী হলেও বর্তমানে জকিগঞ্জে কোনো সাংগঠনিক কমিটি নেই। এদিকে, উপজেলা যুব জামায়াতের সভাপতি আবিদুর রহমান জোর দিয়ে বলেন যে, আবদুস শহীদ আওয়ামী লীগের কোনো স্তরের নেতা তো দূরের কথা, কোনো সক্রিয় রাজনীতির সাথেই জড়িত নন।

জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, জনতা যেহেতু তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে, তাই নিয়ম অনুযায়ী তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা না হওয়ায় তার মুক্তি বা জামিন আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

এই ঘটনার পর জকিগঞ্জের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার দাবি জোরালো হয়েছে। সাধারণ মানুষের মতে, আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষকে হেনস্তা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।