চীনে তুষার চিতার বিরল আক্রমণ: আহত পর্যটকের অবস্থা স্থিতিশীল

প্রকৃতির রহস্যময় এবং অত্যন্ত লাজুক প্রাণী হিসেবে পরিচিত তুষার চিতা বা ‘স্নো লেপার্ড’ সাধারণত মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। তবে সম্প্রতি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে এই বিরল বন্যপ্রাণীর আক্রমণে এক পর্যটক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার কোক্টোকে শহরের একটি জনপ্রিয় স্কি রিসোর্টের সন্নিকটে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার বিবরণ ও নাটকীয় মুহূর্ত

স্থানীয় প্রশাসন ও চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির (CCTV) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই পর্যটক দিনের কর্মসূচি শেষে পাহাড়ি পথ ধরে নিজের হোটেলের দিকে ফিরছিলেন। পথে হঠাৎ করেই বরফে ঢাকা অঞ্চলে একটি তুষার চিতার দেখা পান তিনি। দুর্লভ এই প্রাণীকে সচরাচর লোকালয়ের কাছে দেখা যায় না, তাই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি তিনি। ছবি তোলার প্রবল আগ্রহ থেকে তিনি নিজের গাড়ি থেকে নেমে বন্যপ্রাণীটির অত্যন্ত কাছাকাছি চলে যান। আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই হোক বা বিরক্ত বোধ করায়, তুষার চিতাটি হিংস্র হয়ে হঠাৎ পর্যটকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু শিহরিত করা ভিডিওতে দেখা যায়, পর্যটক বরফের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছেন এবং চিতাটি তার পাশেই অবস্থান করছে। পরবর্তী আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়, হেলমেট পরিহিত ওই ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় দুই পথচারীর সহায়তায় নিরাপদ স্থানে সরে আসছেন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় বন ব্যুরো নিশ্চিত করেছে যে, পর্যটকের আঘাত গুরুতর হলেও বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

তুষার চিতা: চীনের বিপন্ন সম্পদ

তুষার চিতা বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন এবং সুরক্ষিত প্রাণী। চীনের পাহাড়ি অঞ্চলে এদের বড় একটি অংশ বসবাস করে। নিচে তুষার চিতা ও চীনের বনাঞ্চল সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হলো:

বিষয়পরিসংখ্যান ও তথ্য
বিশ্বজুড়ে বর্তমান সংখ্যা৪,০০০ থেকে ৬,৫০০টি (প্রায়)
চীনের আবাসস্থলবিশ্বের মোট সংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ
আবাসের উচ্চতাসমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার
আইনগত সুরক্ষাচীনে প্রথম শ্রেণীর সুরক্ষিত বন্যপ্রাণী (Class A)
স্বভাবঅত্যন্ত লাজুক, ‘পর্বতের ভূত’ (Ghost of the Mountains) নামে পরিচিত

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও বন্যপ্রাণী আচরণ

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ওপর তুষার চিতার আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (WWF) তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাণীগুলো সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে এবং মানুষের অস্তিত্ব টের পেলে দ্রুত লুকিয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিককালে পর্যটন কেন্দ্রের বিস্তার এবং প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্রে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়ার ফলে এ ধরনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, বন্যপ্রাণীর ছবি তোলা বা দেখার সময় ন্যূনতম নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে চিতার মতো দক্ষ শিকারি প্রাণীদের ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়লে তারা মারমুখী হয়ে উঠতে পারে।

জিনজিয়াং প্রদেশের বন বিভাগ এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে পর্যটকদের চলাচলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে এবং বন্যপ্রাণীদের উত্যক্ত না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। তুষার চিতা সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।