চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তা, চাকসু নেতাদের বিতর্ক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাকসুর চারজন নেতার নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে পরীক্ষাকেন্দ্র এলাকা থেকে তাড়া করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন তল্লাশি করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

হেনস্তার শিকার শিক্ষক হলেন আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টর এবং আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠন ‘হলুদ দল’-এর একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। ঘটনার পর তাঁকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন। ওই সময় প্রক্টরিয়াল বডি ও চাকসু নেতারা তাঁর মোবাইল ফোন পরীক্ষা করছিলেন।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় এক মিনিট সাত সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং একজন পেছন থেকে তাঁকে জাপটে ধরেছেন। ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বি এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে শনাক্ত করা গেছে। শিক্ষক তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করছিলেন এবং পরে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়।

প্রক্টর অফিসে নিজের বক্তব্যে হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সময় অন্য শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছ থেকে তিনি পরিস্থিতি ভালো নয়—এমন ইঙ্গিত পান। কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর চাকসু নেতাদের চিৎকারে তিনি আতঙ্কিত হয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাঁকে আটকে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘মব পরিস্থিতি’ তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে চাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বি শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সহকারী প্রক্টর থাকাকালে হাসান মোহাম্মদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগে প্রশাসনিক তদন্ত চলছিল। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, তদন্তাধীন একজন শিক্ষক কেন ভর্তি পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন। একই বক্তব্য দেন দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমানও; তাঁর দাবি, দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে শিক্ষক নিজেই আঘাত পেয়েছেন।

অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ বলেন, তিনি কখনোই জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি বা কোনো দমনমূলক সিদ্ধান্তে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি মৌন মিছিলেও অংশ নেননি এবং কাউকে মামলাও দেননি বলে জানান।

ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটের সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, সিন্ডিকেট থেকে কোনো শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না এলে তিনি দায়িত্ব পালনে আইনগতভাবে বাধাগ্রস্ত নন। সে কারণেই তাঁকে কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকায় তাঁর বেতন স্থগিত রয়েছে, তবে পরীক্ষার দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :

বিষয়বিবরণ
ঘটনা স্থানআইন অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সময়বৃহস্পতিবার দুপুর, প্রায় ১২টা
অভিযুক্ত শিক্ষকহাসান মোহাম্মদ (সহকারী অধ্যাপক)
সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতাচাকসুর ৪ জন নেতা
প্রশাসনিক অবস্থাতদন্ত চলমান, বেতন স্থগিত

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থী রাজনীতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।