দেশের জীবন বিমা খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্রাহকদের বৈধ বিমা দাবি সময়মতো পরিশোধ না করায় এই খাতে বকেয়া দাবির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে উত্থাপিত মোট বিমা দাবির মাত্র ৩৫ শতাংশ পরিশোধ করা হয়েছে, বাকি ৬৫ শতাংশ দাবি এখনও অপরিশোধিত রয়ে গেছে। এই চিত্র শুধু আর্থিক দুর্বলতাই নয়, বরং জীবন বিমা খাতের শাসনব্যবস্থা ও তদারকির বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে দেশের ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানিতে মোট পাঁচ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্থাপিত হয়। এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র দুই হাজার ১০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে তিন হাজার ৮৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দাবি বকেয়া পড়ে রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের দায় গ্রাহকদের জন্য যেমন ভোগান্তির কারণ, তেমনি পুরো বিমা খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বকেয়ার প্রায় ৯০ শতাংশই মাত্র সাতটি কোম্পানির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ ও বায়রা লাইফ—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত দাবি পরিশোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। শুধু এই সাতটি কোম্পানিতেই বকেয়া দাবির পরিমাণ তিন হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। প্রতিষ্ঠানটিতে দুই হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বেশি দাবি উত্থাপিত হলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৯৯ শতাংশ দাবি অপরিশোধিত। একই ধরনের পরিস্থিতি বায়রা লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ও সানফ্লাওয়ার লাইফেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে দাবির তুলনায় পরিশোধের অঙ্ক নিতান্তই নগণ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কোম্পানির দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ পুরো জীবন বিমা খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। প্রগতি লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম মনে করেন, যতদিন এসব কোম্পানি গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে সক্ষম না হবে, ততদিন তাদের নতুন পলিসি ইস্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, গুটিকয়েক কোম্পানির জন্য পুরো খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে হতাশার মাঝেও ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। আলফা লাইফ, এলআইসি বাংলাদেশ, মার্কেন্টাইল লাইফ ও সোনালী লাইফ শতভাগ দাবি পরিশোধ করে দেখিয়েছে যে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকলে গ্রাহকের আস্থা রক্ষা করা সম্ভব। এই কোম্পানিগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি।