খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিশেষ সুযোগ

দেশের ঝিমিয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সংকট নিরসনে একটি বড় ধরনের নীতিসহায়তা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা তাদের বকেয়া খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ অর্থ এককালীন জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়ায় নিয়মিত হওয়া ঋণের বিপরীতে গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত পরিশোধের সময়সীমা লাভ করবেন।

নীতিমালার মূল দিক ও আবেদনের প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি বিশদ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূলত যারা বিগত সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে:

  • যোগ্যতা: শুধুমাত্র ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত যারা ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, তারাই এই আবেদনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

  • আবেদনের শেষ সময়: আগ্রহী ব্যবসায়ীদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে নিজ নিজ ব্যাংকে লিখিত আবেদন জমা দিতে হবে।

  • নিষ্পত্তি: ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আবেদন পাওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে তা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

  • ব্যতিক্রম: ইতিপূর্বে যারা বিশেষ নীতিসহায়তা বা পুনঃতফসিল সুবিধার আওতায় ঋণ নিয়মিত করেছেন, তারা এই নতুন সুবিধাটির জন্য বিবেচিত হবেন না।

পরিশোধের সময়সীমা ও কিস্তি সুবিধা

এই বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে ঋণ নিয়মিত করা হলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের পরিশোধ বিরতি বা ‘গ্রেস পিরিয়ড’ পাবেন। ঋণের কিস্তি শুরু হওয়ার আগে প্রথম দুই বছর কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বস্তির কারণ হবে। এছাড়া যারা কিস্তিতে না গিয়ে এককালীন ঋণ পরিশোধ করতে চান, তারা সর্বোচ্চ এক বছর সময় পাবেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনাপত্তির প্রয়োজন পড়বে না, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজতর করেছে।

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের ঐতিহাসিক ও বর্তমান পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিগত দেড় দশকে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবে নেওয়া ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

খেলাপি ঋণের তুলনামূলক পরিসংখ্যান টেবিল:

সময়কালখেলাপি ঋণের স্থিতি (কোটি টাকা)বার্ষিক/সাময়িক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট
জানুয়ারি, ২০০৯২২,৪৮১বিগত সরকারের মেয়াদের শুরু
জুন, ২০২৪২,১১,৩৯১ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়
সেপ্টেম্বর, ২০২৪৬,৪৪,৫১৫অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ
ডিসেম্বর, ২০২৪৫,৫৭,২১৬বিশেষ সুবিধায় খেলাপি ঋণ হ্রাস (৮৭,২৯৮ কোটি)

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫.৭৩ শতাংশ। তবে বিশেষ ছাড়ের আওতায় প্রায় ৩০০টি শিল্প গ্রুপ তাদের ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করায় ডিসেম্বর শেষে এই হার ৩০.৬০ শতাংশে নেমে আসে। যদিও এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়মিত হওয়া নিয়ে আর্থিক খাতে নানা আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে।

আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান সরকারের উদ্যোগ

ব্যাংকারদের মতে, গত সাড়ে ১৫ বছরে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ব্যাংক খাতের এই নাজুক অবস্থার জন্য দায়ী। বিশেষ করে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো এবং ন্যাশনাল ও বেসিক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ফলে খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশে প্রায় এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার, যার জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে এই ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে নীতিমালায় কঠোরভাবে বলা হয়েছে যে, ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো গ্রাহক নতুন করে কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখা।