খালেদা জিয়ার পাশে দেশে ফিরলেন ডা. জুবাইদা, রাজনীতিতে সক্রিয়তা কি আনবেন?

দীর্ঘ সতেরো বছর পর আবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ডা. জুবাইদা রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার ভূমিকা কেবল পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দলীয় সংকট, নেতৃত্বের প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাব্য সমীকরণে তার নাম ঘুরে ফিরে আসছে।

২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সঙ্গে দেশ ছাড়েন ডা. জুবাইদা রহমান। এরপর টানা ১৭ বছর তিনি স্বামীর সঙ্গে প্রবাসে অবস্থান করেন। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরিবারের ঘনিষ্ঠ অংশ।

চলতি বছরের ৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে তার সঙ্গেই দেশে ফেরেন ডা. জুবাইদা রহমান। দীর্ঘদিন পর তার এই দেশে ফেরা রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও নানা জল্পনা তৈরি করে। যদিও কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি আবার লন্ডনে ফিরে যান, তবুও এই স্বল্প সময়ের উপস্থিতিই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়—তিনি কি স্থায়ীভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছেন?

বর্তমানে খালেদা জিয়া ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৩ নভেম্বর থেকে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। গঠিত মেডিকেল বোর্ডে অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে যে বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে, তার একজন সদস্য হিসেবে ডা. জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে তার পেশাগত ভূমিকার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তার এই উপস্থিতি বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মানসিক দৃঢ়তা ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লন্ডন থেকে ফিরে শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) তিনি ঢাকায় এসে সরাসরি হাসপাতালে যান খালেদা জিয়াকে দেখতে। এমন এক সময়ে তার এই উপস্থিতি সামনে আসে, যখন সারাদেশে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া ও প্রার্থনা চলছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বিএনপির অতীত সংকটকালে যেমন খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ধরে রেখেছিলেন, তেমনি ভবিষ্যতে ডা. জুবাইদা রহমান কি তেমন কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ডা. জুবাইদা রহমান সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হলে তা বিএনপির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের অংশ হওয়ার কারণে তিনি দলের সাংগঠনিক বাস্তবতা, নেতাকর্মীদের মনোভাব এবং জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে একটি প্রাকৃতিক ধারণা রাখেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এখনো তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত, যা বিএনপির জন্য একটি বাড়তি সুবিধা হতে পারে।

তবে এই প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান একটি সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে পরিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতৃত্বে আসবে—এমন ধারণায় তিনি বিশ্বাসী নন। তার ভাষায়, “যে ব্যক্তি দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম, সেই এগিয়ে যাবে। সময় ও পরিস্থিতিই সবকিছু প্রমাণ করবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে একদিকে যেমন উত্তরাধিকার রাজনীতির প্রশ্নে সংযমের ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের জন্য দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেই তারা মনে করছেন।

ডা. জুবাইদা রহমানের সম্ভাব্য ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
দেশত্যাগ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮
প্রবাসে অবস্থানপ্রায় ১৭ বছর
সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তন৫ আগস্ট (খালেদা জিয়ার সঙ্গে)
পেশাগত পরিচয়চিকিৎসক
বর্তমান ভূমিকামেডিকেল বোর্ডের সদস্য
সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভূমিকাকেন্দ্রীয় নেতৃত্বে সহায়ক

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি বর্তমানে নেতৃত্বের একটি শূন্যতা ও দিকনির্দেশনার সংকটে রয়েছে। এই অবস্থায় ডা. জুবাইদা রহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণ দলকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারে। একই সঙ্গে এতে দলীয় ঐক্য, নৈতিক শক্তি এবং জনসমর্থন পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডা. জুবাইদা রহমানের সাম্প্রতিক উপস্থিতি কেবল পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি আদৌ সক্রিয় রাজনীতিতে আসবেন কি না—তা নির্ভর করবে সময়, পরিস্থিতি এবং দলের প্রয়োজনের ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট, তার নাম এখন আর রাজনীতির আলোচনার বাইরে নেই।