ঢাকার কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক চাঞ্চল্যকর মোড় হিসেবে পরিত্যক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জনশূন্য থাকা এই কার্যালয়টিতে দীর্ঘ বিরতির পর এমন তৎপরতা স্থানীয় মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার তারানগর ইউনিয়নের ঘাটারচর এলাকায় অবস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে।
ঘটনার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জুমার নামাজের কিছু আগে বোরকা পরিহিত এক নারী অতর্কিতে ঘাটারচর এলাকায় অবস্থিত পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগ কার্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি দ্রুত ভবনের ছাদে উঠে যান এবং সেখানে সযত্নে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া শেষ করে তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে জানা যায়, ওই নারী কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বিপ্লবের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এই কার্যালয়টিতে বড় ধরনের ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। সেই থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং দলের কোনো স্তরের নেতা-কর্মীকে সেখানে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
এই আকস্মিক তৎপরতার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বিপ্লবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ থাকায় কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সারাদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এটি তারই একটি অংশ হতে পারে।
নিচে কেরানীগঞ্জের এই কার্যালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত সারণি দেওয়া হলো:
| সময়কাল | ঘটনার বিবরণ | বর্তমান অবস্থা |
| ৪ আগস্ট ২০২৪ | কার্যালয়ে ভাঙচুর ও ব্যাপক অগ্নিসংযোগ। | ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। |
| ৫ আগস্ট ২০২৪ | রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নেতা-কর্মীদের প্রস্থান। | কার্যালয়টি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। |
| ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | সোনিয়া আক্তার কর্তৃক ছাদে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। | স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত। |
| বর্তমান পরিস্থিতি | আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি। | এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও কৌতূহল। |
রাজনৈতিক তাৎপর্য ও জননিরাপত্তা
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলো জনরোষের শিকার হয়েছিল। এরপর থেকে দলটির প্রায় সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী আইনি জটিলতা বা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে জনসম্মুখ থেকে দূরে ছিলেন। তবে দীর্ঘ বিরতির পর এই প্রথম কেরানীগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দলীয় কার্যালয়ে এ ধরনের প্রকাশ্য তৎপরতা লক্ষ্য করা গেল।
সচেতন মহলের ধারণা, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ের মাধ্যমে নেতা-কর্মীরা হয়তো নিজেদের দেশপ্রেম ও উপস্থিতির প্রমাণ দিতে চাচ্ছেন। তবে একটি পরিত্যক্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবনে এভাবে বোরকা পরে এসে গোপনে পতাকা উত্তোলন করাকে অনেকেই আইনশৃঙ্খলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং ওই এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কেরানীগঞ্জের এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টা চলছে। এই ধরনের প্রতীকী কর্মকাণ্ড আগামী দিনে স্থানীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
