নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় দীর্ঘদিনের ত্রাস ও কুখ্যাত কিশোর গ্যাং ‘টেনশন’ গ্রুপের প্রধান রাইসুল ইসলাম সীমান্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মৌচাক এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় জনতা তাকে চিনতে পেরে আটক করার পর গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং নেতার গ্রেপ্তারের খবরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
Table of Contents
গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট ও পরিচয়
গ্রেপ্তারকৃত রাইসুল ইসলাম সীমান্ত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদপ্রার্থী শফিকুল ইসলাম শফিকের জ্যেষ্ঠ পুত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর শনিবার রাতে সীমান্তকে মৌচাক এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এ সময় পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটকে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
অপরাধ জগতের খতিয়ান
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত কেবল একটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানই ছিল না, বরং তার নেতৃত্বে সিদ্ধিরগঞ্জ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং জমি দখলের মতো অপরাধ সংঘটিত হতো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
| মামলার ধরন | সংখ্যা/বিবরণ | বর্তমান অবস্থা |
| হত্যা মামলা | বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যার অভিযোগ | তদন্তাধীন |
| হত্যা চেষ্টা | ৩টি (রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতা) | বিচারাধীন |
| অস্ত্র ও মাদক | ২ট (দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার সংক্রান্ত) | অভিযোগপত্র দাখিল |
| ছিনতাই ও চাঁদাবাজি | ১২টির বেশি মামলা ও জিডি | বিভিন্ন মেয়াদে অভিযুক্ত |
| মোট মামলার সংখ্যা | ১৮টি (প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী) | গ্রেপ্তারকৃত |
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বারিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রাইসুল ইসলাম সীমান্ত এলাকার একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। জনতা তাকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ মোট ১৮টি সুনির্দিষ্ট মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তার অপরাধের পরিধি আরও ব্যাপক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে পুলিশ রেকর্ড পরীক্ষা করে তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
ওসি আরও যোগ করেন, সীমান্তে ও তার গ্যাংয়ের সদস্যদের অত্যাচারে মৌচাক, ২ নম্বর ওয়ার্ড এবং সিদ্ধিরগঞ্জের সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আগামীকাল তাকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
সীমান্তের গ্রেপ্তারের পর এলাকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো উল্লাস প্রকাশ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ‘টেনশন গ্রুপ’ নামের এই কিশোর গ্যাংটি মূলত তরুণদের বিপথে পরিচালিত করত এবং রাজনৈতিক মিছিলে ভাড়ায় খাটত। শামীম ওসমানের পতনের পর থেকে এই গ্রুপের সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও সীমান্ত পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের দাবি, কেবল সীমান্ত নয়, তার সহযোগী ও অর্থদাতাদেরও যেন আইনের আওতায় আনা হয়।
