২০২৫ সালে এশিয়া মহাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার একটি বিশাল অংশ কোনো বীমা সুবিধার আওতায় ছিল না। সুইজ রি নামক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘সিগমা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর এশিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মোট ক্ষতির ৯২ শতাংশই ছিল বীমাহীন। যদিও ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবে তা মোট ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই পরিসংখ্যানটি এশীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যমান আর্থিক সুরক্ষার বিশাল ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান ও কারণসমূহ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এশিয়ায় দ্রুত নগরায়ণ, ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সম্পদের ক্রমবর্ধমান ঘনত্বের কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও ২০২৫ সালে বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ (৫.২ বিলিয়ন ডলার) পূর্ববর্তী ১০ বছরের গড় ১১.৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম এবং গত নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, তবুও বীমা সুরক্ষার বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ ক্ষতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বীমা পলিসির উচ্চ মূল্য, সাধারণ মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে এই সুরক্ষা গ্যাপ বা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে এশিয়ায় প্রধান তিনটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে প্রাপ্ত বীমাকৃত ক্ষতির চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| দুর্যোগের ধরন | বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ (মার্কিন ডলার) | মোট ক্ষয়ক্ষতির আনুপাতিক প্রভাব |
| ভূমিকম্প | ১.৯ বিলিয়ন | ঐতিহাসিক ক্ষতির প্রধান উৎস |
| বন্যা | ১.৭ বিলিয়ন | দ্রুততম ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি |
| ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় | ১.২ বিলিয়ন | উপকূলীয় অঞ্চলের প্রধান দুর্যোগ |
| মোট | ৫.২ বিলিয়ন | এশিয়ার সম্মিলিত বীমাকৃত ক্ষতি |
উন্নত বনাম উদীয়মান বাজার
এশিয়ার উন্নত অর্থনীতি এবং উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে বীমা সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট মোট ক্ষতির গড়ে ২২ শতাংশ বীমার আওতায় থাকে। বিপরীতে, উদীয়মান এশীয় বাজারগুলোতে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া মূলত সরকারি তহবিল বা ব্যক্তিগত ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বন্যার ক্রমবর্ধমান প্রকোপ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বন্যা এশিয়ার জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে এশিয়াজুড়ে বন্যার ফলে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এশিয়ায় বন্যাজনিত বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির হারের (৬ শতাংশ) দ্বিগুণ। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রতি বছর এই ঝুঁকি বাড়লেও বর্তমানে এশিয়ায় বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতির মাত্র ২০ শতাংশ বীমার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে।
১৯৭০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এশিয়ার বার্ষিক বীমাকৃত ক্ষয়ক্ষতির ৯০ শতাংশের বেশি সংঘটিত হয়েছে ভূমিকম্প, বন্যা এবং ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে। ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। পর্যাপ্ত বীমা কাঠামো গড়ে না উঠলে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
