যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক শেষ পর্যন্ত কুখ্যাত মার্কিন ধনকুবের ও দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য স্বীকার করেছেন। মঙ্গলবার ক্যাপিটল হিলে আয়োজিত এক শুনানিতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি নিশ্চিত করেন যে, ২০১২ সালে তিনি সপরিবারে এপস্টিনের সেই বিতর্কিত দ্বীপে গিয়েছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, কারণ ইতিপূর্বে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে এপস্টিনের অপরাধ কর্মকাণ্ড ফাঁস হওয়ার অনেক আগেই তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।
পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও নতুন তথ্য
বাণিজ্যমন্ত্রী লুটনিক এর আগে কংগ্রেসের কাছে দাবি করেছিলেন যে, ২০০৫ সালেই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। নিউইয়র্কে প্রতিবেশী থাকাকালীন এপস্টিনের একটি কক্ষে ‘যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ’ মালিশের টেবিল দেখে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে মঙ্গলবারের শুনানিতে তিনি স্বীকার করেন যে, ২০০৫ সালের পর পরবর্তী ১৪ বছরে তিনি অন্তত দুবার এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করেছেন।
তদন্তকারী নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর লুটনিক ওই দ্বীপে গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এর চার বছর আগেই ২০০৮ সালে শিশুদের যৌনকর্মে বাধ্য করার দায়ে এপস্টিন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। লুটনিকের দেওয়া তথ্যমতে, তিনি তাঁর স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে নৌভ্রমণে থাকাকালীন সেখানে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলেন।
লুটনিকের সফর ও সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও সময়কাল |
| প্রাথমিক দাবি | ২০০৫ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলেছিলেন। |
| দ্বীপে সফরের তারিখ | ২৩ ডিসেম্বর, ২০১২ (পরিবারসহ সফর)। |
| সফরের ধরন | নৌভ্রমণের সময় এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নভোজ। |
| পরবর্তী সাক্ষাৎ | ২০১২ সালের সফরের প্রায় দেড় বছর পর আরও একটি বৈঠক। |
| নথিতে উল্লেখ | বিচার বিভাগের ১০টি ইমেইলে লুটনিকের নাম পাওয়া গেছে। |
| বর্তমান অবস্থান | এপস্টিনের কোনো অপকর্মে যুক্ত থাকার অভিযোগ নেই। |
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পদত্যাগের দাবি
লুটনিকের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন শুনানিতে লুটনিকের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাকে রীতিমতো তুলোধুনো করেন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের অনেক নেতাই এখন নীতিগত কারণে বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। বিশেষ করে কংগ্রেস সদস্য রো খান্না এবং থমাস ম্যাসি, যারা এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের জন্য আইন প্রণয়ন করেছিলেন, তারা লুটনিকের পদত্যাগের দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার।
সিনেটরদের মতে, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার এমন লুকোচুরি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যখন জানা যায় যে এপস্টিন দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও লুটনিক তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন, তখন বিষয়টি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান
তীব্র সমালোচনা ও পদত্যাগের দাবির মুখেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন হাওয়ার্ড লুটনিকের ওপর পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করেছে। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে লুটনিকের ওপর প্রেসিডেন্টের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। লুটনিক নিজেও দাবি করেছেন যে, এপস্টিনের সঙ্গে তার কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল না এবং প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথিতে তার নাম মাত্র কয়েকবার এসেছে।
বর্তমানে বাণিজ্যমন্ত্রী লুটনিকের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, এই ঘটনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এপস্টিনের কুখ্যাত দ্বীপের ‘ভিজিটর লগ’ বা সফরকারীদের তালিকায় আরও কার কার নাম রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
