এক পরিবারে তিন রাষ্ট্রনেতা কারা

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—এমন রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে চলেছে: একই পরিবারের তিন সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁদের পুত্র তারেক রহমান—এই তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব জিয়া পরিবারকে বিশ্বরাজনীতির বিরল রাজনৈতিক পরিবারগুলোর কাতারে নিয়ে যাচ্ছে।

রাজতন্ত্রের বাইরে গণতান্ত্রিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা নয়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন কিছু পরিবার রয়েছে, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব প্রজন্ম পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশের জিয়া পরিবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে।

বাংলাদেশে জিয়া পরিবার

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড দেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

স্বামীর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তিন দফায় সরকারপ্রধান ছিলেন (১৯৯১–১৯৯৬, ১৯৯৬, ২০০১–২০০৬)। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন ও সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি নিজেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বর্তমানে তারেক রহমানের সম্ভাব্য শপথের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবার তিন প্রজন্মে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়ার নজির স্থাপন করছে।

পরিবারদেশসদস্য সংখ্যাদায়িত্বের ধরন
জিয়া পরিবারবাংলাদেশরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

ভারত: নেহরু–গান্ধী পরিবার

ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে জওহরলাল নেহরু ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং জরুরি অবস্থা জারির মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য আলোচিত হন। তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী ১৯৮৪ সালে দেশের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হন। এই পরিবার ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।

পরিবারদেশসদস্যসময়কাল
নেহরু–গান্ধীভারত১৯৪৭–১৯৯১ (বিভিন্ন মেয়াদে)

পাকিস্তান: ভুট্টো পরিবার

জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টো মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী আসিফ আলী জারদারি প্রেসিডেন্ট হন। তিন প্রজন্মে রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভুট্টো পরিবার পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্থায়ী ছাপ রেখেছে।

শ্রীলঙ্কা: বন্দরানায়েকে পরিবার

এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে, তাঁর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে (বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী) এবং তাঁদের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা—এই পরিবার শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক অনন্য ত্রয়ী সৃষ্টি করেছে। মা প্রধানমন্ত্রী ও মেয়ে প্রেসিডেন্ট—এমন নজির বিশ্বে বিরল।

উত্তর কোরিয়া: কিম পরিবার

কিম ইল-সাং থেকে শুরু করে কিম জং-ইল এবং বর্তমান নেতা কিম জং-উন—উত্তর কোরিয়ায় তিন প্রজন্মে রাষ্ট্রক্ষমতা একই পরিবারের হাতে। যদিও এটি কার্যত বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থা, তবুও আধুনিক বিশ্বে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের শাসনের এক বিরল উদাহরণ।

থাইল্যান্ড: সিনাওয়াত্রা পরিবার

থাকসিন সিনাওয়াত্রা, তাঁর বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এবং কন্যা পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা—এই পরিবার থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে। সামরিক অভ্যুত্থান ও আদালতের রায়ে ক্ষমতাচ্যুতি সত্ত্বেও পরিবারটির রাজনৈতিক প্রভাব টিকে আছে।

গ্রিস: পাপানড্রেউ পরিবার

জর্জিয়াস পাপানড্রেউ, তাঁর পুত্র আন্দ্রেজ পাপানড্রেউ এবং নাতি জর্জ পাপানড্রেউ—তিন প্রজন্মে গ্রিসের সরকারপ্রধান হয়েছেন।

তুলনামূলক চিত্র

পরিবারদেশতিন প্রজন্ম?রাজনৈতিক ব্যবস্থা
জিয়াবাংলাদেশহ্যাঁগণতান্ত্রিক
নেহরু–গান্ধীভারতহ্যাঁসংসদীয় গণতন্ত্র
ভুট্টোপাকিস্তানআংশিক (৩ সদস্য)সংসদীয়
বন্দরানায়েকেশ্রীলঙ্কাহ্যাঁসংসদীয়
কিমউত্তর কোরিয়াহ্যাঁএকদলীয়
সিনাওয়াত্রাথাইল্যান্ডহ্যাঁসাংবিধানিক রাজতন্ত্র
পাপানড্রেউগ্রিসহ্যাঁসংসদীয়