উত্তরার অগ্নি ট্র্যাজেডি: সপরিবারে নিভে গেল ফজলে রাব্বীর প্রাণ

রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় লাগা ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন কুমিল্লার কাজী ফজলে রাব্বী (৩৭), তার স্ত্রী আফরোজা বেগম সুবর্ণা (৩০) এবং তাদের একমাত্র তিন বছর বয়সী সন্তান কাজী ফায়াজ রিশান। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালের এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও উদ্ধার তৎপরতা

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টার দিকে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। প্রায় ২৫ মিনিটের প্রচেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সকাল ১০টার দিকে তা পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। তবে ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিবারের তিন সদস্যই অচেতন হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময়ানুক্রমিক তথ্য নিচে টেবিল আকারে প্রদান করা হলো:

পর্যায়সময়ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
সূত্রপাতসকাল ০৮:০০ভবনের দ্বিতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের সূচনা।
তৎপরতাসকাল ০৮:১০ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের উপস্থিতি।
নিয়ন্ত্রণসকাল ০৮:২৫আগুনের বিস্তার রোধ ও নিয়ন্ত্রণ।
নির্বাপণসকাল ১০:০০আগুন সম্পূর্ণ নেভানো ও তল্লাশি শেষ।

এক শোকাতুর পারিবারিক ইতিহাস

কাজী ফজলে রাব্বীর জীবনের গল্পটি ছিল অত্যন্ত বেদনার। প্রায় দুই বছর আগে তার প্রথম স্ত্রী তিথী আকস্মিক অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ সময় একাকীত্ব ও শোক কাটিয়ে ওঠার পর স্বজনদের অনুরোধে তিনি তিথীরই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী আফরোজা বেগম সুবর্ণাকে বিয়ে করেন। তাদের ছোট সংসারে শিশু রিশান ছিল আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। কর্মব্যস্ত দিনে রাব্বী তার সন্তানকে নানুর বাড়িতে রেখে কর্মস্থলে যেতেন। কিন্তু শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় পরিবারের সবাই একসাথে বাড়িতেই ছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

নিহত রাব্বীর মা ফেরদৌস আরা বেগম একজন শিক্ষক। তিনি বর্তমানে দেবিদ্বার গার্লস হাইস্কুলে কর্মরত। একমাত্র পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতির মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ও তার স্বামী কাজী খোরশেদুল আলম কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শেষ বিদায় ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

ঢাকায় প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও প্রথম জানাজা শেষে শুক্রবার রাতেই মরদেহগুলো কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীরপাড়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে দারোগা বাড়ি জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর শনিবার সকালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া কাজী বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট কিংবা গ্যাসের লিকেজ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে আগুনের সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চালাচ্ছে।