ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা

দীর্ঘ ৩৯ দিন ধরে চলা হামলা–পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী ইরান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার আগে কিছু কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হলেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সংক্রান্ত শর্তে ইরানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় বৈঠক আয়োজনের পথ সুগম হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকের আগেই একটি প্রাথমিক সমঝোতামূলক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ইসলামাবাদে সংলাপে অংশ নেবে। তিনি এই উদ্যোগকে শান্তি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, প্রক্রিয়াটি এখন “নির্ণায়ক পর্যায়ে” পৌঁছেছে, যেখানে এটি সফলও হতে পারে আবার ব্যর্থও হতে পারে।

ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তারা শনিবার ভোরে ইসলামাবাদে পৌঁছান। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাদের স্বাগত জানান উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক, চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলও ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার।

ইসহাক দার আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো গঠনমূলক আলোচনা করবে এবং পাকিস্তান স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে সহায়তা করবে।

১৯৭৯ সালের পর এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে আলোচনার আগে ইরান কিছু শর্ত আরোপ করে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে এবং বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার ফেরত না দেওয়া হলে তারা আলোচনায় অংশ নেবে না।

দিনভর ইসলামাবাদ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলতে থাকে। এর ফলে কিছু অগ্রগতি দেখা যায়, বিশেষ করে বৈরুত ও দাহিয়ায় ইসরায়েলি হামলা কিছুটা কমে আসে। তবে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা অব্যাহত থাকে।

প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান ও আলোচনার এজেন্ডা

পক্ষপ্রধান অবস্থানদাবি/শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রপারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করাইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানো, পারমাণবিক উপাদান নিয়ন্ত্রণ
ইরাননিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও স্বীকৃতিনিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক অধিকার স্বীকৃতি, জব্দ অর্থ ফেরত
আলোচনার কাঠামোআঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যুদ্ধবিরতিহরমুজ প্রণালী, ক্ষেপণাস্ত্র সীমা, আঞ্চলিক প্রভাব

ইরানের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানান, ইরানের অংশগ্রহণ দুটি শর্তের ওপর নির্ভর করছে—লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে জব্দ অর্থ মুক্ত করা। এসব শর্ত পূরণ না হলে আলোচনা শুরু হবে না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় আন্তরিকভাবে অংশ নিতে প্রস্তুত, তবে সময়ক্ষেপণের কোনো কৌশল গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন, ইরানের হাতে সীমিত বিকল্প রয়েছে এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ পুনরায় বিবেচনা করা হতে পারে।

আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো, হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জটিল ইস্যু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে এসব বিষয়ে মৌলিক মতপার্থক্য বিদ্যমান থাকায় আলোচনার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।