মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এ অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অস্ত্রের ব্যবহার, অভিযানের পদ্ধতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযানের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
গেন্ডারিয়ায় অভিযান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার, ১৭ অক্টোবর, বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায়। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। পরে ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। আটক কয়েকজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্যসংবলিত আরেকটি ভিডিওও সামনে আসে।
প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গাড়ি থেকে নেমে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁকে লোকজনকে ধরার নির্দেশ দিতে শোনা যায়। তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
ভিডিওর আরেক অংশে রেললাইনের পাশে অবস্থান করা কয়েকজনকে ধরতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় এক তরুণকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ, স্যার।’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ আসবে তারপর কথা হবে।’
ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা পিস্তলের কিছু অংশ ঝাপসা করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। অভিযানের একপর্যায়ে একজন দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা যায়।
এসব দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পর অভিযানের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার সময় অস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের বিধান, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ এবং সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষমতার সীমা নিয়ে আলোচনা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানের দাবি
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, শনিবার বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে তাঁরা সেখানে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে বারবার অভিযোগ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি।
পাভেল শিকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের বিষয়ে পুলিশকে আগেই জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে।
অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু ছিলেন। এ ছাড়া একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। পাভেল জানান, ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের কাছেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। ভিডিওতে সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে দেখা গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এক তরুণকে লাথি মারার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে পাভেল দাবি করেন, ওই ব্যক্তি ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর সরকারি দেহরক্ষী।
তবে অভিযানের সময় ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং সেখানে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। ভিডিওতে দৃশ্যমান ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
অস্ত্র বৈধ বলে দাবি প্রতিমন্ত্রীর
অভিযানের ভিডিও প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা পিস্তলটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি অস্ত্রটি বৈধ হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
শনিবার রাতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের সময় ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ। নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ না করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পর তিনি অস্ত্রটি সংগ্রহ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্রটি নেওয়ার সময় হলফনামায় তা উল্লেখ করার সুযোগ ছিল না।
এ ক্ষেত্রে অস্ত্রের বৈধ মালিকানা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি বহন বা প্রদর্শনের বৈধতা আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির কাছে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেই সব পরিস্থিতিতে তা প্রদর্শনের অনুমতি রয়েছে, এমন নয়। অস্ত্র বহনের উদ্দেশ্য, ব্যবহারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হয়।
অস্ত্র ব্যবহারে নীতিমালার বিধান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বহন বা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
এই বিধান সামনে রেখে প্রতিমন্ত্রীর অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অস্ত্রটি বৈধ হলেও ঘটনার সময় কী উদ্দেশ্যে এবং কোন পরিস্থিতিতে তা প্রদর্শন করা হয়েছিল, তদন্তে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট ঘটনায় কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও প্রাসঙ্গিক আইন বিবেচনা করতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বের অংশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ পেলে জনপ্রতিনিধি বা সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে আইনগত ক্ষমতার সীমা, জননিরাপত্তা এবং আটক ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
অভিযানের সময় অস্ত্র প্রদর্শন, দেহরক্ষীদের ভূমিকা এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়গুলো তাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে হয়েছে, অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় আসতে পারে।
তদন্তের ফলের দিকে নজর
ডিএমপি জানিয়েছে, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারের তদন্তে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হবে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের বিধান মেনে চলা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার দাবি থাকলেও সেই উদ্যোগের পদ্ধতি আইনসম্মত ছিল কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
তদন্তের ফল প্রকাশিত হলে অভিযানের প্রকৃত পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং কোনো বিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছিল কি না, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আপাতত ডিএমপির তদন্তের দিকেই নজর রয়েছে।









