মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মুখে মস্কো ও বেইজিং কূটনৈতিকভাবে সরব হলেও সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক প্রকার কৌশলী দূরত্ব বজায় রাখছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর এই দুই পরাশক্তির প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক: অংশীদারত্ব বনাম আইনি বাধ্যবাধকতা
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিতে সামরিক সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের কথা থাকলেও এটি কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নয়। উত্তর কোরিয়ার সাথে রাশিয়ার যে ধরনের সামরিক চুক্তি রয়েছে, ইরানের সাথে তেমনটি নেই। ফলে ইরান আক্রান্ত হলে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধে নামার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।
রুশ চিন্তক আন্দ্রেই কর্তুনভের মতে, মস্কো বর্তমানে ইউক্রেন সংকট সমাধানে ওয়াশিংটনের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তাই ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আরও তিক্ত করার ঝুঁকি রাশিয়া নিতে চাইছে না।
চীন-ইরান সম্পর্ক: অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নীতিগত অবস্থান
২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে চীন ও ইরানের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশের গন্তব্য হলো চীন। তবে বেইজিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’। চীনের গবেষক জোডি ওয়েনের মতে, বেইজিং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরানের পাশে থাকলেও কোনো অবস্থাতেই সেখানে অস্ত্র বা সৈন্য পাঠাবে না। চীনের কাছে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস হলেও, বিশ্ববাণিজ্যের তুলনায় ইরানের বাজার তাদের কাছে তুলনামূলক ছোট।
রাশিয়া ও চীনের ইরান নীতির তুলনামূলক চিত্র
| বৈশিষ্ট্য | রাশিয়ার অবস্থান | চীনের অবস্থান |
| সম্পর্কের ধরন | কৌশলগত ও সামরিক অংশীদার | অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নির্ভর অংশীদার |
| প্রধান চুক্তি | ব্যাপকভিত্তিক কৌশলগত অংশীদারত্ব (২০২৫) | ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি (২০২১) |
| সামরিক হস্তক্ষেপ | সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই | হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অটল |
| মূল স্বার্থ | ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও পশ্চিমা বিরোধী জোট | জ্বালানি নিরাপত্তা ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প |
| বর্তমান ভূমিকা | কূটনৈতিক নিন্দা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় | মধ্যস্থতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা |
কেন দূরত্ব বজায় রাখছে মস্কো ও বেইজিং?
মস্কো ও বেইজিং উভয়েই যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। তবুও ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে না নামার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
ইউক্রেন ও তাইওয়ান ইস্যু: রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। অন্যদিকে চীন তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে নিজস্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তৃতীয় কোনো ফ্রন্টে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো তাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: চীনের অর্থনীতি বিশ্ববাজারের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামলে চীনের ওপর বড় ধরনের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, যা বেইজিং এড়াতে চায়।
কূটনৈতিক ভারসাম্য: রাশিয়া ও চীন উভয়েই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিশালী দেশ যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ইরানের পক্ষে একতরফা যুদ্ধে নামলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাশিয়া ও চীন ইরানের ‘বন্ধু’ হলেও তারা ‘যোদ্ধা’ হতে রাজি নয়। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা হতাশা থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে মস্কো ও বেইজিং তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাদের ভূমিকা বর্তমানে মূলত ‘সুরক্ষামূলক’ ও ‘কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার’ মধ্যে আবদ্ধ।
