ইরান নিয়ে ট্রাম্পের জরুরি বৈঠক: রণপ্রস্তুতির ঘোষণা তেহরানের

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর প্রশাসনের কঠোর দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক এখন বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘সব সীমা লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে দেশটিতে নতুন করে সামরিক অভিযানের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলায় তাদের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিক্ষোভ ও মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র

টানা ১৬ দিন ধরে চলা এই গণবিক্ষোভ বর্তমান ইরান সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা সাড়ে ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ইরান সরকারের দাবি অনুযায়ী, সংঘর্ষে তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ জন সদস্যও নিহত হয়েছেন। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন যে পরিস্থিতি এখন ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’, তবুও বিশ্বজুড়ে তেহরানের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।

ইরান সংকট ও উভয় পক্ষের সামরিক অবস্থানের তথ্যসমূহ নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

এক নজরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও সক্ষমতা

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান
বিক্ষোভের বর্তমান স্থিতি১৬তম দিন (চলমান)।
নিহত বিক্ষোভকারীঅন্তত ৬৪৮ জন (মানবাধিকার সংস্থার দাবি)।
মার্কিন সামরিক বিকল্পবিমান হামলা, সাইবার অস্ত্র ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র পাল্লামধ্যপাল্লা (১২৪০ কিমি) ও স্বল্পপাল্লা (৪৩৫ কিমি)।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান৮টি দেশে স্থায়ী ঘাঁটি (বাহরাইন, কাতার, কুয়েতসহ)।
ইন্টারনেট পরিস্থিতিগত ৪ দিন ধরে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠক ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজ মঙ্গলবার তাঁর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসছেন। এই বৈঠকে ইরানের পরমাণু স্থাপনা বা সামরিক ঘাঁটিতে সম্ভাব্য হামলাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলা বা সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার পথও বেছে নিতে পারে। তবে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেছেন যে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা চালালে বিপুল পরিমাণ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক প্রভাব

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে কোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েল সরাসরি তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের হাতে থাকা স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়ে কাতার, কুয়েত বা আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা সম্ভব। গত বছরের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সংলাপের ক্ষীণ আশা

উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও সংলাপের পথ একেবারে রুদ্ধ হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু প্রস্তাব দিয়েছে যা বর্তমানে তেহরান পর্যালোচনা করছে। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার নির্দেশ মেনে বা হুমকির মুখে তারা আলোচনায় বসবে না।

বর্তমানের এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন ওয়াশিংটনের আজকের সিদ্ধান্তের দিকে। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের পথ বেছে নেবে নাকি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করবে, তা ঘিরেই এখন সব জল্পনা।