ইরানে হামলায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে স্পেনের নিষেধাজ্ঞা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন-স্পেনীয় যৌথ সামরিক ঘাঁটিগুলো নিয়ে মাদ্রিদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সোমবার (২ মার্চ) স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জন্য স্পেন তাদের ভূখণ্ড এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না।

মাদ্রিদের কঠোর অবস্থান ও কূটনৈতিক বার্তা

স্পেনের এই সিদ্ধান্ত মূলত দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস স্পেনের জনপ্রিয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘টেলেসিনকো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে কোনো সামরিক অভিযানে স্পেনের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।” প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার প্রথম থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মাদ্রিদের এই অনড় অবস্থান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপের সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন বিমান প্রত্যাহার

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার ২৪’ (Flightradar24)-এর তথ্যমতে, সোমবার ভোরে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় রোটা (Rota) ও মোরন (Morón) বিমানঘাঁটি থেকে অন্তত ১৫টি মার্কিন সামরিক বিমান উড্ডয়ন করেছে। স্প্যানিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণেই মূলত এই বিমানগুলো ঘাঁটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদের মধ্যে অন্তত সাতটি বিমান জার্মানির রামস্টেইন (Ramstein) বিমানঘাঁটিতে গিয়ে অবতরণ করেছে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, এই বিমানগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার’ (Boeing KC-135 Stratotanker), যা আকাশে অন্য যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত থাকে।

নিচে স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি এবং সেগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

ঘাঁটির নামঅবস্থানবিশেষত্ববর্তমান পরিস্থিতি
রোটা নেভাল বেসকাদিজ, স্পেননৌ ও বিমান বাহিনীর কৌশলগত কেন্দ্র।মার্কিন বিমানসমূহ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মোরন এয়ার বেসসেভিল, স্পেনদ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত।অভিযানে ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাখ্যাত।
রামস্টেইন বেসজার্মানিইউরোপে মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রধান কেন্দ্র।স্পেন থেকে আসা বিমানগুলো এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিভাজন

ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে স্পেন যখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ছিল কিছুটা দোলাচলের মধ্যে। শুরুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তবে গত রবিবার তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ‘সম্মিলিত আত্মরক্ষার’ (Collective Self-Defence) অজুহাতে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের অনুমতি দেন। স্পেনের এই স্বাধীনচেতা অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ভেতরেও এক ধরণের নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রভাব ও আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের এই পদক্ষেপ কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইরানের পাল্টা হামলা ইউরোপের জ্বালানি বা নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে, তবে মাদ্রিদের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ আরও বাড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পেন সরকার যুদ্ধের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সংকট সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানি রোধে স্পেনের এই ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হলেও ন্যাটো জোটের ভেতরে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে।