ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানে আবারও সামরিক হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রস্তুত এবং প্রয়োজন মনে করলে ‘যখন খুশি’ আঘাত হানতে পারে।
গত বুধবার দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করলেও নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তাঁর এমন মন্তব্যের মধ্যেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে।
ইরানের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ১৪২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই নারী ও এক শিশু রয়েছে। আহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী এবং ৪৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতিটি হতাহতের সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ এবং একটি পরিবার রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বেসামরিক মানুষের ওপর সংঘাতের প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনা বাড়ছে
জুলাইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র আকার নিয়েছে। গত বুধবার ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরান কুয়েত, বাহরাইন ও ইরাকে হামলা চালিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে জানা যায়।
ইরান জানিয়েছে, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের সর্বশেষ হামলায় ওই অঞ্চলের কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কুয়েতেও থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা সফল হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের তিনজন সামরিক পাইলট এবং নৌবাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা নতুন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
ইরানের হামলার নিন্দা বাহরাইনের
কুয়েতকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় ইরানের নিন্দা জানিয়েছে বাহরাইন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ধারাবাহিকভাবে কুয়েতকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ইরান দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। বাহরাইনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থী।
এক বিবৃতিতে বাহরাইন বলেছে, এসব হামলা আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে। ইরানকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
বেসামরিক প্রাণহানিতে জাতিসংঘের উদ্বেগ
চলমান সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বিশেষ করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর নিয়ে তিনি উদ্বেগ জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানিয়েছেন, গুতেরেস অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহাসচিব বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলার নিন্দা করেছেন এবং সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স এক ইমেইলে বলেন, তারা প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে অবহিত। তাঁর দাবি, এসব তথ্য প্রথমে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায় না।
আগের স্কুল হামলার সঙ্গেও তুলনা
ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগকে অনেকে সংঘাতের প্রথম দিনের একটি স্কুলে হামলার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন। মিনাবের ওই স্কুলে হামলায় প্রায় ১৬০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পেন্টাগন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মিনাবের ওই হামলা নিয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেয়নি। কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুইটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হালনাগাদ না করা গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ওই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন সদস্য প্রশাসনের তদন্তে উঠে আসা তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তবে তাঁদের কাছে তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদন এখনো পাঠানো হয়নি।
ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।










