ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সাধারণ মানুষের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করে। মূলত সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করেছে।

নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ও প্রেক্ষাপট

মার্কিন ট্রেজারি দপ্তরের বিবৃতিতে বিশেষভাবে ইরানের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি-র নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইরানের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী (এলইএফ)-এর প্রধান নীতি-নির্ধারক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বাহিনীটি বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীকে দমন ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। মার্কিন প্রশাসনের মতে, এস্কান্দার মোমেনির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশেই নিরাপত্তা বাহিনী বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মূল তথ্যাবলি

যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং কোনো মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিচে নিষেধাজ্ঞার মূল বিষয়গুলো একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

নিষেধাজ্ঞার বিষয়বিস্তারিত তথ্য
প্রধান টার্গেটএস্কান্দার মোমেনি (ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
অভিযুক্ত সংস্থাইরানের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী (LEF)
প্রাথমিক কারণশান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন
নিষেধাজ্ঞার ধরনসম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ও আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা
ঘোষণা প্রদানকারীমার্কিন ট্রেজারি দপ্তর (OFAC)
ভৌগোলিক প্রভাবমার্কিন বিচারব্যবস্থার আওতাধীন সকল এলাকা

ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি

ইরানে গত কয়েক মাস ধরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, নাগরিক স্বাধীনতার অভাব এবং কঠোর পোশাকবিধির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাজপথে সোচ্চার হয়েছে। তবে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা রিপোর্ট করেছে। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস আচরণ বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর বিদ্যমান ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব

মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, যারা মৌলিক মানবাধিকার পদদলিত করছে, তাদের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করাই এই নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, ইরান বরাবরের মতোই এই ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। তেহরানের দাবি, পশ্চিমারা ইরানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের একক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও, এটি আন্তর্জাতিক মহলে ইরানকে নৈতিকভাবে চাপে ফেলবে। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশে ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা আরও কয়েক ধাপ বৃদ্ধি পেল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকেও বার্তা দিয়েছে যে, মানবাধিকার ইস্যুতে তারা কোনো ধরনের আপস করবে না।